সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আমাদের দায়িত্ব।

সময় চলে যাচ্ছে খুব দ্রুত।
পাশের বাড়ির চাচার চুল ভর্তি মাথায় টাক পড়ে গেছে।
গাঁয়ের খেলার মাঠ টি দখল করে নিয়েছে বিশাল বড় দালানে।কৃষি জমিগুলোতে ড্রাগনের ছোঁবল পড়েছে।পাড়ার প্রাথমিক স্কুলটিতে এখন আর বালকদের পড়াতে চাননা বাবা মা।বস্তা ভর্তি বই নিয়ে সকাল সকাল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পাড়ি জমায় বাচ্ছারা,উদ্দেশ্য বস্তা ভর্তি জ্ঞান আহরণ।

সকালের মক্তবটি এখন ধুলোবালি পড়ে জীর্ণ শীর্ণ।দুপুরের ভাত খেয়ে ছেলেরা ঘুমের ফাঁকি দিয়ে ফুটবল,ক্রিকেট খেলতে যায়না আর।সন্ধা ঘনিয়ে আসলে চাঁদের আলোতে চোর পুলিশ খেলা,গোল্লা ছুট খেলা খেলতে দেখা যায়না এখন আর।

চায়ের দোকানে মুরুব্বিদের দেখলে আসন ছেড়ে দিতে দেখা যায়না ছোটদের।বড়দের দেখলে সিগারেট মুখ থেকে নামায়না সাহসী ছেলেগুলো। এখন আর আগের মত প্রেম এর নামে চিঠি চালাচালি চলেনা।বন্ধু বন্ধুকে,বান্ধবি বান্ধবিকে অডিও ক্যাসেট উপহার দেয়না।

ঈদের দিন বড়দের সালাম দিয়ে ঈদগাহ মাঠে যাওয়ার চিরাচরিত অভ্যাস টা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হওয়ার পথে।দুই টাকা দিয়ে বিটিভির সাপ্তাহিক ছায়াছবি দেখার প্রবণতা এখন আর স্বচল নয়।বিয়ে বাড়িতে কলাগাছের গেইট আর দেখা যায়না। বর এর হাত থেকে মিষ্টি বা জিলাপির মাটির পাতিল চুরি করতে ওঁত পেতে থাকেনা শ্যালকের দল।মুক্ত বাতাসের বিশুদ্ধ অক্সিজেন টেনে নেওয়ার ক্ষমতাটা যেন দিন দিন হারিয়ে ফেলছে আজকের শিশু ও কৈশোর প্রজন্ম।

এখন আর আগের মত কোন সালিশ কেউ মানতে চায়না।যেমন বাড়ছে পুলিশ,তেমন বাড়ছে মামলা,সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হানাহানি,মারামারি।বাড়ছে পাতি নেতা,বাড়ছে নব্য মাতব্বর।

আস্তে আস্তে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে শহর থেকে গ্রামে।পাখার বদলে এসি লাগানো হচ্ছে।টিনশেড বাদ দিয়ে বিল্ডিং নির্মাণ করা হচ্ছে।খেলার মাঠে কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট গড়ে উঠছে।শিক্ষার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।

পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে সাদা মনের মানুষদের সম্মান দেখানো হচ্ছে।যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজনৈতিক দল তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে নেতার স্যখ্যা,বেশি সভা হচ্ছে সমাবেশ হচ্ছে,প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

কিন্তু আমরা আধুনিক হয়েছি প্রযুক্তিতে, আমরা আমাদের মনকে,আমাদের চরিত্রকে আধুনিক করতে পেরেছি?আমরা কি দিতে পেরেছি আমার পরবর্তি প্রজন্ম যারা শান্তিতে বেড়ে উঠবে সমাজে? আমারা কি নিশ্চিত করতে পেরেছি সন্ধা ঘনিয়ে আসার পর কোমলমতি শিশুদের খোলা মাঠে চাঁদের আলোতে গোল্লা ছুট খেলার নিরাপত্তা?আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতি পেলেও আমরা কি পেয়েছি আমাদের বোন নুসরাত,তনুদের নিরাপত্তা!আমরা কি পেরেছি প্রতিবেশির বাড়ির সামনে দেয়াল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করার বিকৃত মানসিকতা ঝেড়ে ফেলতে!

না আমরা পারিনি আমাদের সমাজকে আধুনিক করতে।আমরা পারিনি আমাদের মানসিকতাকে আধুনিক করতে।আমরা পারিনি আমাদের সত্ত্বাকে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য স্বান্তনার কেন্দ্র বানাতে।

আধুনিকতা বলতে কি বুঝি আমরা?কানে হেডফোন,আরওয়ান ফাইভ মোটরসাইকেল এর গিয়ার বাড়িয়ে দাফিয়ে বেড়ানো,ফেসবুক,ম্যাসেঞ্জার,ইউটিউব একাউন্টের মালিক,জিন্স প্যান্টের সাথে পাঞ্জাবি পরিধান,রাস্তায় হেঁটে যাওয়া নারীর উদ্দেশ্যে শিস দেওয়া,অথবা অন্যের বউ ভাগিযে বিয়ে করা,অথবা বিচারের নামে এক বস্তা টাকা খাওয়া,মুক্ত মতের নামে ধর্ম বিদ্বেষ ছড়ানো।না না।এগুলো তো আধুনিকতা নয়।তাহলে কি আধুনিকতা মানে একসাথে কয়েকটা বয়ফ্রেন্ড,গার্লফ্রেন্ড এর লাভার হওয়া?

না ভাই এসবকে আধুনিকতা বলেনা।আধুনিকতা হচ্ছে আমার ছোট্টবেলার স্বধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া বর্তমান প্রজন্মকে,আমরা যেভাবে নির্ভয়ে বেড়ে উঠেছি বর্তমান ও পরবর্তি প্রজন্মকেও সেই নিশ্চয়তা দেওয়া।আমাদের মন মানসিকতা,চিন্তা,চেতনা আধুনিক করতে হবে।আমাদেরকে মানবিক হতে হবে।আমাদের শিশু,কিশোর,যুবক,যুবতি,বৃদ্ধ,বৃদ্ধা সকল বয়সের মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে হবে।স্কুল,মাদ্রাসায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মন থেকে পশুত্ব ঝেড়ে ফেলতে হবে।শিক্ষার নামে বাণিজ্য বন্ধ করে সুশিক্ষার মাধ্যমে সভ্য জাতির সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে হবে।যে শিক্ষার মাধ্যমে সন্ত্রাস,ধর্ষক তৈরী হবে সে শিক্ষা চাইনা।

আমরা এমন পরিবর্তন চাই যে পরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হবে একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থা। আমরা এমন পরিবর্তন চাইনা যে পরিবর্তনের কারনে প্রজন্মের পর প্রজন্মে সৃষ্টি হবে বিকৃত মানসিকতার সিরাজ মাষ্টার,আবির্ভাব হবে পরিমলের মত দিকভ্রষ্ট শিক্ষক।

আসুন আমরা পরিবর্তন করি আমাদের সমাজকে।আমরা আমাদের ভেতরের বিকৃত মনুষ্যত্বকে ঝেড়ে ফেলি।আমাদের সৎকর্ম ও সৎ উদ্যোগের সুফল পাবে আপনার আমার উত্তরসূরী প্রজন্ম।

আমাদের সচেতনার কারনে সুস্থ,স্বাভাবিক, আলোকিত সমাজে বেড়ে ওঠার পরিবেশ পাবে আমাদেরই ছোট ভাই,সন্তান,আত্মীয়, প্রতিবেশী।

—ইব্রাহিম খলিল দিপু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here