অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার।

অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার।

অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার। পাইলস বা অর্শ এই শব্দটি শুনলেই আমাদের মাঝে একধরনের লজ্জা এবং অস্বস্তি অনুভূতি জেগে উঠে। কিন্তু এই রোগটি অনেক পুরাতন এবং যুগের পর যুগ ধরে এই রোগের কার্যকরী ঔষধ বা চিকিৎসা আবিষ্কারের কাজ চলছে।

আশেপাশের রাস্তায় দেওয়ালে লেখা থাকে অথবা অনেক সময় বাসের জানালা থেকে একটা চিরকুট আকারের কাগজ হাতে চলে আসে লেখা থাকে -‘পাইলস বা অর্শ ,ভগন্দর চিকিৎসা নিন। একশত পারসেন্ট  সুস্থতা গ্যারান্টিসহ।’ 

কত জন এই কথাগুলোতে বিশ্বাস করেন তা অবশ্য অজানা।তবে পাইলসের চিকিৎসার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোগী অনেক সময় সংকোচ-বোধ করেন বিশেষত মহিলারা।

এরফলে অনেক দেরি করে চিকিৎসকের কাছে যান যখন পাইলস অনেক বেড়ে যায় । এই কষ্ট থেকে নিজেকে বাচাতে এবং কিছু টা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সম্পর্কে কিছু আলোচনা  তুলে ধরা হল।আশাকরি প্রথম থেকেই সচেতন হলে পাইলস রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ।অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার।

পাইলস বা অর্শ বা অরিশ

পাইলস শব্দটি ইংরেজী, যার বৈজ্ঞানিক নাম হেমোরয়েডস(Hemorrhoids)। এর বাংলা আভিধানিক অর্থ হল অর্শ এবং আঞ্চলিক অর্থ অরিশ। 

পাইলস বলতে সাধারণত যা বোঝায় তাহল-পায়ুপথ থেকে মলত্যাগের সময়ে রক্ত বের হয়ে আসা। এই রক্ত বের হওয়ার সময়ে কোনো রকম যন্ত্রণা অনুভূতি হয়না।তবে পাইলসের শেষ দুই পর্যায়ে ব্যথা অনুভূত হয়।অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে পাইলসের সংজ্ঞা 

হেমোরয়েডস বা পাইলস বলতে বোঝায় পায়ুপথের এবং মলদারের ফুলে যাওয়া শিরা এবং মাংসপিণ্ড। এই শিরা গুলো এবং নরম মাংসপিণ্ড মল নিয়ন্ত্রণ করে।এই কারনে এই শিরাগুলি ফুলে গেলে মলত্যাগের সময় রক্ত বের হয়ে আসে।অর্শ্ব বা পাইলস এর কারন লক্ষণ প্রতিকার।

পাইলসের প্রকার ভেদ এবং ধাপ সম্পর্কে ধারনা নিচে দেওয়া হল।

জেনে নিন পাইলস বা অর্শ এর ধাপ-সমূহ

পাইলস সাধারণত দুই-প্রকার হয়ে থাকে।এই প্রকারভেদ পাইলসের অবস্থান অনুযায়ী করা হয়েছে।যেমন:

  • আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস।
  • বাহ্যিক হেমোরয়েডস।
আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস। বাহ্যিক হেমোরয়েডস।

আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস আসলে কি?

মানবদেহের শরীরের ভিতরে পায়ুপথের বিদ্যমান শিরা ফুলে গেলে, তার আশেপাশের অঞ্চলো ফুলে যায়।মলত্যাগের সময় ব্যাথাছাড়া রক্ত বেরিয়ে আসে।এই অবস্থা কে বলা হয় আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস।

বাহ্যিক হেমোরয়েডস আসলে কি?

বাহ্যিক হেমোরয়েডস মলদারের আশেপাশের জায়গা ফুলে গিয়ে চুলকানি, অস্বস্তিকর জ্বালাযন্ত্রনা এবং রক্ত বের হয়। এই অবস্থাকে বলে বাহ্যিক হেমোরয়েডস।

আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস বা পাইলসকে চিকিৎসা বিজ্ঞানিরা চারটি ধাপে বা চারভাবে শ্রেনীবিন্যাস করেছেন। এই চার শ্রেনীবিন্যাস করার একমাত্র কারন, পাইলস রোগের সঠিক চিকিৎসা নির্নয় করা।

সেই চার টি শ্রেনীবিন্যাস হল:

শ্রেণীবিন্যাস বা গ্রেইডলক্ষনছবিসহ ডায়াগ্রামচিকিৎসা
প্রথম গ্রেইড রক্ত বের হয় শুধুমাত্র ঔষধ,মলম এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ।
দ্বিতীয় গ্রেইড আভ্যন্তরীণ পাইলস মলত্যাগের সময় বের হয়ে পরে আবার ঢুকে যায়।আর রক্ত বের হয় ।ঔষধ,মলম বা সাপেজিটর অথবা ইনজেকশন 
তৃতীয় গ্রেইড মলদারে মাংস বেরিয়ে আসে এবং তা ঠেলে ঢুকিয়ে দিতে হয়।অপারেশন 
চতুর্থ গ্রেইড মলদারে মাংস বেরিয়ে থাকে তা ঢুকালে আবার বেরিয়ে পরে এবং ব্যাথা থাকে।অপারেশন 

পাইলসের লক্ষনগুলো কি কি?

পাইলসের লক্ষন বলতে আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন মলত্যাগের সময়ে রক্ত বের হওয়া।কিন্তু এছাড়াও কিছু কিছু লক্ষন দেখা যায়।।যেমন:

আভ্যন্তরীণ হেমোরয়েডস বা পাইলসের লক্ষনগুলো হল-

  • মলত্যাগের সময় কোনও ব্যাথা ছাড়া রক্ত দেখতে পাওয়া ।
  • পায়ুপথের ভিতর-থেকে মলদারের কাছে মাংস বেরিয়ে আসে এবং ব্যাথা থাকে।

বাহ্যিক হেমোরয়েডস বা পাইলসের লক্ষন গুলো হল-

  • মলদারের কাছে চুলকানি এবং জ্বলন অনুভূতি হওয়া।
  • ব্যাথা ও অস্বস্তি লাগা।
  • মলদার ফুলে যাওয়া।
  • রক্ত বের হওয়া 

উপরের লক্ষন গুলি যদি বারবার দেখা যায়।তাহলে বুঝতে হবে পাইলস হওয়ার সম্ভবনা আছে।একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ গ্রহন করতে হবে।

পাইলস হওয়ার কারনসমূহ

পাইলস বা অর্শ হওয়ার অনেক কারন রয়েছে।তারমধ্যে পারিবারিক বা বংশগত ভাবেও হতে পারে একটি কারন।কারনগুলো নিচে দেওয়া হল

  • দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য।
  • দীর্ঘমেয়াদি ডায়ারিয়া।
  • গর্ভবতী হলে।
  • শরীরে অতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে।
  • একটানা বসে কাজ করলে।
  • একটানা ভারি কাজ করলে।
  • কম শাকসবজি বা অতিরিক্ত চর্বি-যুক্ত খাবার খেলে।
  • পায়ুপথে যৌন-মিলন করলে।
  • দীর্ঘসময় টয়লেটে বসে থাকলে।
  • বল প্রয়োগকরে মলত্যাগ করলে।
  • বার্ধক্যের কারনে হেমোরয়েড শিরাই কপারটিকার অনুপস্থিতি হলে।

প্রতিকারের উপায় সমূহ

পাইলসের প্রতিকার এরজন্য প্রয়োজন সচেতনতা।একজন রোগী যদি সচেতন হতে পারেন তাহলে অনেকাংশে তিনি ভাল হয়ে যেতে পারেন।

উপরে দেখানো পাইলসের শ্রেনীবিন্যাস এর মধ্যে প্রথম তিন শ্রেণীর পাইলসের রোগীর বেলাতে চিকিত্সক সাধারণত ঔষধ এবং কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন।পরামর্শ গুলি নিচে দেওয়া হল-

  • বেশি বেশি আঁশ-যুক্ত খাবার গ্রহন করা।

               আঁশ-যুক্ত খাবারের মধ্যে পরে সকল ধরনের শাক যেমন:

কচুশাক,মূলা-শাক, ডাটাশাক,পুঁইশাক,কলমিশাক,

মিষ্টিআলুর শাক, লাউ -মিষ্টি কুমড়োর শাক ইত্যাদি।

সবজির মধ্যে আঁশযুক্ত খাবার যেমন-

সজিনা,কলার মোচা,ঢেঁড়স,ডাটা,বাঁধাকপি, ফুলকপি,ওলকপি,

গাজর,শিম,পটল,কচু,বেগুন,বরবটি ও মটরশুটি ইত্যাদি ।

আরও পড়ুনঃ https://sonalikantha.com/করোনা-ভাইরাস-থেকে-সচেতন-হ/

ফলের মধ্যে আশ-যুক্ত ফল হল-

বেল,পেয়ারা, কদবেল,আমড়া,আতাফল,নারিকেল, কালোজাম,কামরাঙ্গা,পাকা টমেটো,পাকা আম,পাকা কাঠাল ইত্যাদি ।

এছাড়াও সকল ধরনের ডাল যেমন-মটর,মুগ,ছোলা এইগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণ আঁশ বিদ্যমান।

এইসকল ধরনের আঁশযুক্ত খাবার আপনার শরীরের গ্যাসট্রিকের সমস্যা যেমন দূর করবে তেমন ভাবে আপনার মলকে নরম করে দিবে যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয় ।

  • প্রচুর পরিমাণ পানি পান-

প্রতিদিন কমপক্ষে আট গ্লাস পানি পান এবং পানীয় জাতীয় খাবার গ্রহন করতে হবে।অবশ্যই এরমধ্যে বেভারেজ বা আলকোহল পরে না।পানি এবং পানীয় জাতীয় খাবার আপনার মলকে নরম করতে সহযোগিতা করে।

  • মলত্যাগের সময়  অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • দীর্ঘ-সময় বসে থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে।কিছুক্ষণ পর পর হাঁটাচলা করতে হবে যারা বিশেষত অফিসে বসে থেকে কাজ করেন।
  • শারীরিক চর্চা বা বায়াম বা এক্সারসাইজ করতে হবে।এইজন্য কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করা যেতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠ্যকাঠিন্য ও ডায়ারিয়ার চিকিৎসা করতে হবে।

পাইলসের চিকিৎসা কি?

প্রথমেই বলেছিলাম যে পাইলসে প্রথম তিনটি শ্রেণীর পাইলস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসকেরা সাধারণত ঔষধ,মলম এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।কিন্তু যারা এই বিষয়গুলি মেনে চলতে পারেননা অথবা লজ্জাজনিত কারনে দীর্ঘদিন চেপে রাখেন পাইলসের সমস্যাকে। তারা চতুর্থ এবং পঞ্চম অবস্থায় চলে আসেন।

চতুর্থ ও পঞ্চমশ্রেনীর রোগীদের বেলায় চিকিৎসকেরা সাধারণত অপেরেশন করেন।সেই অপেরেশন আবার কয়েক পদ্ধতিতে হয়ে থাকে।তারমধ্যে কিছু নাম এখানে দেওয়া হল।যেমন-

  • বাবারব্যান্ড বা রিং লাইগেশন।
  • ইনজেকশন স্কেলেরোথেরাপি বা মিট্চশেল টেকনিক।
  • লেজার অপারেশন ।
  • লংগো অপারেশন 

বর্তমানে লংগো অপারেশন বেশি কার্যকর এবং অত্যাধুনিক তো বটেই।এই অপারেশনে আপনার পায়ুপথের ভিতরের দিক থেকে মাংস প্লাস্টিক সার্জারির মত কেটে বাদ দিয়ে জোরা লাগানো হবে যাতে ঝুলে থাকা মাংস আবার জায়গায় চলে আসে।তবে এই অপারেশন যথেষ্ট ব্যয়বহুল এবং একজন অভিজ্ঞ সার্জন ই পারেন সফলভাবে অপারেশন করতে।

পায়ুপথে একমাত্র কি পাইলস হয়?

আমাদের মধ্যে একটা সাধারণ চিন্তা হল পায়ুপথ থেকে রক্ত বের হলেই তা পাইলস হবে।কিন্তু পায়ুপথে আরো অনেক রোগ আছে যার কারনে রক্ত দেখা দিতে পারে।যেমন-

  • ফোঁড়া ।
  • ফিস্টুল
  • ফিশার ।
  • ক্যানসার ।

এই কারনে আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে আসলে আপনার কোন রোগটি হয়েছে ।এইজন্য আপনাকে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিতে হবে।তার পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুরোপুরি জেনে নিতে হবে যে আসলেই আপনার পাইলস বা অর্শ রোগ আছে।

পরিশেষে 

আমাদের অসচেতনতার কারনে পাইলস রোগটি অনেক বেড়ে যায়।অনেক সময় কম অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা করার প্রবনতার জন্য আমরা নিকটবর্তী হাতুড়ে ডাক্তার বা কবিরাজ এর কাছে গিয়ে পাইলসের সমস্যা সমাধান করতে চাই।এতে যে ফলাফল দেখা যায় তাতে অনেক সময় রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে পরে।অনেক সময় রোগীর ভুল চিকিৎসার জন্য পেরালাইসিস হয়ে যেতে পারেন।

এইধরনের ভয়াবহতার সম্মুখীন হওয়ার আগেই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহনকরুন।

প্রাথমিক অবস্থাতেই লজ্জা না পেয়ে সচেতন হয়ে উঠুন।সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম করুন।আপনি আপনার পাইলস থেকে নিজেই মুক্তি পাবেন। মনেরাখা খুব ই প্রয়োজন পাইলস বা অর্শ এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ যা পুরোপুরি নির্মুল করা সম্ভব হয় না।একমাত্র তা সঠিক জীবন যাপন করে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। 

আরও পড়ুনঃ https://www.bd-pratidin.com/life/2017/02/08/206462

সুতরাং এখন থেকেই সচেতন হয়ে উঠুন কারন কথায় বলে Prevention is better than cure.

লিখেছেন তানজিলা ফারজানা তানি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here