রমজান মাসের ফজিলত

রমজান মাসের ফজিলত

রমজান মাসের ফজিলত রমজান শব্দটি রমজ শব্দ থেকে এসেছে।

রমজ শব্দের অর্থ হল দাহন। মুসলমানদের কাছে রমজান মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আরবি মাসের ভেতরে এই রমজান মাসকে কোরানের বসন্তকাল বলা হয়। কারণ এই পবিত্র রমজান মাসে কোরআন মাজীদ নাযিল হয়। শবে কদরও এই রমজান মাসেই বিদ্যমান। শবে কদরের রাত হাজার হাজার মাসের রাত অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ রাত।

 

রমজান মাসে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা অনেক সহজ। এ মাস আত্মশুদ্ধির মাস। সারা জীবনের এবং পরকালের শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে চাওয়ার সহজতর মাস হলো রমজান। রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে মুসলিমগণ আত্মিক উন্নতির মাধ্যমে মহান আল্লাহর অনেক কাছে পৌঁছাতে পারেন। রোজা শব্দের অর্থ হলো বিরত থাকা বা সংযম সাধনা। রমজানের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

 

 يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

 

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। ( সূরা বাকারা আয়াতঃ ১৮৩)

 

এবং আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সে মাসকে পায় সে যেন রোজা রাখে।”( সূরা বাকারা আয়াতঃ ১৮৫)

 

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসের কিতাবগুলোতে অনেক হাদিস রয়েছে। এর ভেতর থেকে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরা হলোঃ

 

## রমজানে যারা রোজা রাখবে তাদের জন্য রয়েছে সম্মান। রোজাদাররা সেদিন রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না, এই বিষয়ে সহীহ হাদিসটি হলঃ

 

মাসয়ালাঃ খালিদ ইবনু মাখলাদ (রহঃ) … সাহল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জান্নাতে রায়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাঁদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে, সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তাঁরা ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাঁদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে। ( সহীহ বুখারী ৩২৫৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮৫২২)

 

আরও পড়ুনঃ    তালাক সম্পর্কে ইসলাম কি বলে

 

## রমজান মাসের ফজিলত সাওম বা রোজার গুরুত্ব অনেক, কেননা, রোজা রাখার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ নিজেই দিবেন। এবং সাওম পালনকারী ব্যক্তির মুখের গন্ধ মহান আল্লাহতালার কাছে অধিক প্রিয়, এই বিষয়ে সহীহ হাদীসটি হলঃ

 

মাসয়ালাঃ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমল দশ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিন্তু এর ব্যতিক্রম হলো সওম। কেননা, সওম আমার জন্যে রাখা হয় এবং আমিই এর প্রতিদান দিব। কারণ সায়িম (রোযাদার) ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির তাড়না ও খাবার-দাবার শুধু আমার জন্য পরিহার করে। সায়িমের জন্য দু’টি খুশী রয়েছে। একটি ইফতার করার সময় আর অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। সায়িমের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের সুগন্ধির চেয়েও বেশী পবিত্র ও পছন্দনীয় এবং সিয়াম ঢাল স্বরূপ (জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষাকবচ)। তাই তোমাদের যে কেউ যেদিন সায়িম হবে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে আর শোরগোল বা উচ্চবাচ্য না করে। তাকে কেউ যদি গালি দেয় বা কটু কথা বলে অথবা তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, সে যেন বলে দেয়, ‘আমি একজন সায়িম’। ( সহীহ বুখারী ১৯০৪, মুসলিম ১১৫১, নাসায়ী ২২১৭, ইবনু মাজাহ ১৬৩৮, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৮৯৪, ইবনু খুযায়মাহ্ ১৮৯৬, সহীহ ইবনু হিববান ৩৪২৩, আহমাদ ৭৬৯৩, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮৩৩২)

 

## পবিত্র রমজান মাস আসলে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং শয়তানকে বেঁধে রাখা হয, এই বিষয়ে যে হাদীসটি রয়েছে তা হলোঃ

 

মাসয়ালাঃ ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শৃংখলিত করে দেয়া হয় শয়তানকে। ( সহীহ বুখারী ১৮৯৯, ৩২৭৭, মুসলিম ১০৭৯, নাসায়ী ২০৯৯, ২০৯৭, ২১০২, আহমাদ ৭৭৮০, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাজ্জাকব ৭৩৮৪, ৭৭৮১, ৯২০৪, শু‘আবূল ঈমান ৩৩২৬, সহীহ ইবনু হিববান ৩৪৩১)

 

## রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল কদরের রাত। আর এই পবিত্র রাতে কোরআন মাজীদ নাযিল হয়। এ রাতের গুরুত্ব অনেক। এরাতে যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় ইবাদত পালন করবে, আল্লাহ তা’আলা তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন, এই বিষয়ে যে হাদীসটি এসেছে তা হলোঃ

 

মাসয়ালাঃ মুসলিম ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি লাইলাতুল ক্বাদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তাঁর পিছনের সমস্ত গুনাহ মাপ করা হবে। আর যে ব্যাক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তাঁরও অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে।  ( সহীহ বুখারী ৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪, মুসলিম ৭৬০, আবূ দাঊদ ১৩৭২, নাসায়ী ২২০৫, ইবনু মাজাহ ১৬৪১, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৮৭৫, আহমাদ ৭১৭০, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ১৮৯৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮৫০৬, সহীহ ইবনু হিববান ৩৪৩২)

 

## পবিত্র রমজান মাসের প্রথম রাতেই জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এবং একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন, পাপাচারীদের বিরত থাকতে এবং এবং কল্যাণকামী দের সামনে অগ্রসর হতে। এই বিষয়ে সহীহ হাদীসটি হলঃ

 

মাসয়ালাঃআবূ কুরায়ব মুহাম্মদ ইবনু আলা ইবনু কুরায়ব (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রমজান মাসের ফজিলত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রামাযান মাসের প্রথম রাতেই শয়তান ও দুষ্ট জ্বীনদের শৃঙখলাবদ্ধ করে ফেলা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না; জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, এর একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেনঃ হে কল্যাণকামী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে জাহান্নাম থেকে বহু লোককে মুক্তি দান। প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। ( তিরমিযী ৬৮২, ইবনু মাজাহ ১৬৪২, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ১৮৮৩, মুসতাদারাক লিল হাকিম ১৫৩২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮৫০১, সহীহ ইবনু হিববান ৩৪৩৫, সহীহ আল জামি‘ ৭৫৯)

 

আরও পড়ুনঃ   রমজান ও জুমআর দিনে মৃত্যুবরণের আলাদা কোনো ফজিলত আছে কী?

## সাওম পালনকারী ব্যক্তির জন্য কোরআন মাজীদ ও সিয়াম সুপারিশ করবে এবং উভয়ের সুপারিশই গ্রহণ করা হবে, এই বিষয়ে সহীহ হাদিসটি হলঃ

 

মাসয়ালাঃ আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা‘আত করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা‘আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। ( মুসতাদারাক লিল হাকিম ২০৩৬, শু‘আবূল ঈমান ১৮৩৯, সহীহ আল জামি‘ ৩৮৮২, সহীহ আত্ তারগীব ৯৭৩)

 

## রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের রাতের গুরুত্ব যে কত, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই রহমত থেকে শুধুমাত্র আভাগারাই বঞ্চিত হবে এই বিষয়ে যে হাদীসটি রয়েছে তা হলোঃ

 

মাসয়ালাঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রমাযান (রমজান) মাস এলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রমাযান (রমজান) মাস তোমাদের মাঝে উপস্থিত।রমজান মাসের ফজিলত এ মাসে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের (কল্যাণ হতে) বঞ্চিত রয়েছে; সে এর সকল কল্যাণ হতেই বঞ্চিত। শুধু হতভাগ্যরাই এ রাতের কল্যাণ লাভ হতে বঞ্চিত থাকে। (রইবনু মাজাহ ১৬৪৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৪২৯, আহমাদ ৬৬২৬, সহীহ আল জামি‘ ৩৮৮২, হাকিম ২০৩৬, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৮৮)

 

আয়েশা রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here