কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পাটুয়ারটেকে অবস্থিত ‘টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারানো ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে নিখোঁজের তালিকায় থাকা স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার কোনো খোঁজ এখনো মেলেনি।
শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মধ্যে ঢাকার দুটি পৃথক পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। এর মধ্যে একটি পরিবারের ছয়জন এবং অপর পরিবারের চারজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
নিহত একটি পরিবারের সদস্যরা হলেন—ঢাকার শ্যামলীর বাসিন্দা ও গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর সহধর্মিণী আফসানা মতিন (৩৬), এবং তাঁদের দুই শিশুকন্যা রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।
অপর পরিবারের নিহত সদস্যরা হলেন—মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), তাঁদের আরেক কাজিন ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী সন্তান মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার খিলগাঁও ও বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
নিহত মোহাম্মদ নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধীনে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেসে অধ্যয়নরত ছিলেন। অন্যদিকে লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
সিআইডির (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) ল্যাবে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় এবং স্বজনদের দেওয়া নমুনার সাথে মিল রেখে নিখুঁতভাবে সবার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমন ঘোষ পরিচয় নিশ্চিতকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহগুলো স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হবে।
তবে নিখোঁজ থাকা স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৭) সন্ধান এখনো মেলেনি। তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, উদ্ধারকৃত মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনার সাথে তাঁর দেওয়া নমুনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে রিমন ঘোষ বলেন, “স্থানটি থেকে মোট ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তাঁদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে স্বজনদের নমুনার মিল পাওয়া গেলেও, মুক্তার ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কোনো মরদেহের নমুনার মিল পাওয়া যায়নি।”
নিখোঁজ মুক্তা ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকায় অবস্থিত ‘স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের’ একজন শিক্ষিকা। তিনি দুই বান্ধবীর সাথে ভ্রমণ করতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং তাঁর বাবার নাম মোস্তফা কামাল।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর রিসোর্টটি থেকে ১০ জনের লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। তবে নিখোঁজের তালিকায় নাম ছিল ১১ জনের। যার ফলে উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের হিসাব নিয়ে শুরু থেকেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়। মুক্তার ডিএনএ-র সাথে মরদেহের মিল না থাকায় তাঁকে ঘিরে স্বজনদের উদ্বেগ ও রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
উখিয়ার পাটুয়ারটেকের রিসোর্টে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ঘটনায় ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। দায়ের করা মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। অন্যদিকে রিসোর্টের অপর মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে পাটুয়ারটেকের ওই রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে আগুন নেভাতে ও উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। বেলা ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর পুরোদমে তল্লাশি চালানো হয়। এই উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করেছিলেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা।
উদ্ধার অভিযান শেষে পুড়ে যাওয়া রিসোর্ট থেকে ১০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় মারাত্মক দগ্ধ ও আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের পর মামলা দায়েরের পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় অধিবাসীদের তথ্যমতে, রিসোর্টটির ভেতরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরই চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠার সময় ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন পর্যটককে দ্রুত বের হয়ে আসতে দেখা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে কমিটি এখনো পর্যন্ত তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।