মোঃ আল-আমিন সরকার, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
একসময় গ্রামীণ জনপদে সাপুড়েদের সাপের খেলা কিংবা নারীদের লোকজ চিকিৎসা মানুষের নজর কাড়লেও সময়ের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই ঐতিহ্য। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও জীবিকার তাগিদে বংশপরম্পরার এই পেশা ও যাযাবর জীবন এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ঘাটিনা ব্রিজসংলগ্ন করতোয়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে এমনই এক ভাসমান বসতি। স্থায়ী ঠিকানা ঢাকার সাভার হলেও কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোই এখন তাঁদের জীবনের নিত্যদিনের রুটিন। করতোয়ার পাড়ে অস্থায়ী তাঁবু বা কুঁড়েঘর তৈরি করে বর্তমানে বসবাস করছেন প্রায় ৩০টি সাপুড়ে বেদে পরিবার। নদীর তীরজুড়ে সারি সারি ঘর, রান্নার ব্যস্ততা আর শিশুদের কলকাকলিতে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময়ের বড় এই বহরে অর্ধশতাধিক পরিবার থাকলেও সময়ের স্রোতে তা সংকুচিত হয়ে এখন ৩০টিতে ঠেকেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সাপের ঝাপি কাঁধে নিয়ে হাটবাজারে ঘুরে লোকরঞ্জন ও সাপের খেলা দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে আধুনিক বিনোদন আর প্রযুক্তির যুগে এই পেশার কদর ও আয় দুটোই তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে, নারীরাও বসে নেই; তাঁরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিংগা লাগানোসহ সনাতন লোকজ চিকিৎসার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বহরের এক নারী জানান, গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকজ চিকিৎসা করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে দিন চলে। কাজ না থাকলে বা আবহাওয়ার অবনতি ঘটলে তাদের সংসারে নেমে আসে চরম অনটন।
এদিকে, যাযাবর জীবনের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ। নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা না থাকায় তাদের নিয়মিত পড়াশোনা, সুচিকিৎসা কিংবা নিরাপদ শৈশবের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বড়দের সঙ্গে জেলা থেকে জেলায় ঘুরে বেড়ানোই তাদের নিয়তি।
করতোয়া পাড়ের এই অস্থায়ী বসতি কেবল ৩০টি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই নয়; এটি গ্রামবাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক সুপ্রাচীন ইতিহাসের প্রতীক। ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার এই নিরন্তর লড়াইয়ের পাশাপাশি বেদে পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে নিরাপদ আবাসন, শিশুদের শিক্ষা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..