×
সদ্য প্রাপ্ত:
গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী একাত্তরের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, চব্বিশ ছিল রক্ষার: প্রধানমন্ত্রী খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোরে ভূরাজনৈতিক শঙ্কা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী একটি মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কে প্রবাসীদের গাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: চালকসহ গ্রেফতার ৩, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার তাহসিফ হত্যা মামলায় আবারও ৩ দিনের রিমান্ডে দীপ
  • প্রকাশিত : ২০২৬-১১-০৭
  • ২২ বার পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদক:

প্রায় দুই বছর আগে সফলভাবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া সত্ত্বেও বাণিজ্যিকভাবে চালু না হওয়া ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সচলতার মুখ দেখতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সঁপে দিতে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল’-এর সাথে ৫ বছরের আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে নোঙর করা বিশালাকার মাদার ট্যাংকার থেকে সরাসরি উপকূলীয় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পথ উন্মোচিত হলো। বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, আগামী ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হবে। বিপিসির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচল হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বছরে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ বিপিসির লিয়াজোঁ অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতি। বিপিসির পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক এবং পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর হ্যারিস আবদি সেমবিরিং মেলিয়ালা। ওই সময় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি ও বিপিসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুমোদিত এই চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৫ বছর সময়কালের জন্য এই এসপিএম মূল স্থাপনার যাবতীয় পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্ব পালন করবে ইন্দোনেশিয়ার ওই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ ৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তির সার্বিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত ডাইরেক্ট ক্যাবিনেট কমিটিতে ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠানটিকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করে জানান, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হলো এবং চুক্তি অনুযায়ী অতি দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ কার্যক্রম শুরু করবে পারতামিনা।

উল্লেখ্য, এতদিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড় করা বড় বিদেশি মাদার ট্যাংকার থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজে লাইটারিং প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তেল খালাস করে উপকূলে পাম্প করে আনতে হতো। বহু পুরোনো এই প্রচলিত পদ্ধতিতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত সময়ের অপচয় হতো, তেমনি বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও ব্যাহত হতো। কিন্তু এই নবনির্মিত এসপিএম প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই হলো—গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত মূল তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাইপলাইনের সাহায্যে তেল খালাস সম্পন্ন করে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় শতভাগে নামিয়ে আনা।

সম্পূর্ণ আধুনিক নকশায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে অবস্থান করা সুবিশাল তেলবাহী মাদার ট্যাংকারগুলো সাগরের তলদেশের বিশেষ ভাসমান বয়ার (Mooring Buoy) সাথে নিরাপদে যুক্ত থাকবে। সেখান থেকে শক্তিশালী পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল পৌঁছে যাবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কালারমারছড়ায় বিশেষভাবে নির্মিত বিশাল ট্যাংক ফার্মে। পরবর্তীতে সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেল সেখান থেকে সমুদ্রতলদেশের মূল পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এ সরাসরি পাঠানো হবে। একই সাথে পরিশোধিত ডিজেল দ্রুত সংরক্ষণ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনের জন্যও রয়েছে পৃথক সুনির্দিষ্ট পাইপলাইনের ব্যবস্থা।

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ কে এম নইম উল্যা এই বিষয়ে নিশ্চিত করেন যে, আগামী জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এসপিএমের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করা যাবে। পুরো প্রকল্পটির অধীনে গভীর সমুদ্রে ভাসমান মুরিং, শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশন, মহেশখালীতে বিশালাকার ট্যাংক ফার্ম এবং সমুদ্রতলদেশ দিয়ে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ পাইপলাইন সফলভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এই অবকাঠামোতে অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল এবং পরিশোধিত ডিজেল আলাদাভাবে পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক দুটি পাইপলাইনের বৈচিত্র্য রাখা হয়েছে।

বিপিসির কারিগরি প্রাক্কলন ও সমীক্ষা অনুযায়ী, মানধাতা আমলের প্রচলিত লাইটারেজ পদ্ধতিতে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস করতে যেখানে টানা ১০ থেকে ১২ দিন দীর্ঘ সময় লেগে যেত, সেখানে এই নতুন এসপিএম প্রযুক্তির মাধ্যমে একই পরিমাণ তেল মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় সম্পূর্ণ খালাস করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল খালাস করতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ ঘণ্টা। এর ফলে বহির্নোঙরে বিদেশি পতাকাবাহী মাদার ট্যাংকারের অপ্রয়োজনীয় ডেমারেজ বা অপেক্ষমাণ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে; একই সাথে লাইটারেজ জাহাজের বুকিং ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন ভাড়াও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। সার্বিকভাবে এতে সরকারের বার্ষিক অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে বলে বিপিসি আশা প্রকাশ করছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের বিশেষ আর্থিক সহায়তায় বিপিসি স্বউদ্যোগে এই ঐতিহাসিক মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির মূল অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’। প্রাথমিক অবস্থায় প্রকল্পটির বাজেট ৫ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হলেও অবকাঠামোগত পরিধি বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের কারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটির চূড়ান্ত নির্মাণ ও পরীক্ষামূলক পাম্পিং টেস্ট সফলভাবে শেষ হয়। তবে আন্তর্জাতিক অপারেটর বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ঠিকাদার নিয়োগের প্রশাসনিক জটিলতা ও বাণিজ্যিক প্রস্তুতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের কারণে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর বিনিয়োগটির কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত থাকে।

প্রসঙ্গত, চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল হলো ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ও তেল-গ্যাস সংক্রান্ত জায়ান্ট পারতামিনা গ্রুপের সমুদ্র পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের বিশেষায়িত প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাপী অফশোর সামুদ্রিক পরিবহন, গভীর সমুদ্রের বন্দর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও বিশালাকার টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।

তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসপিএম চালু হওয়ার সাথে সাথেই এর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা শতভাগ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, প্রকল্পটিতে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের যে আধুনিক পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে, তার বার্ষিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ টন। অথচ আমাদের দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান বার্ষিক তেল শোধন করার সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন। এর ফলে পাইপলাইনের উদ্বৃত্ত ৩০ লাখ টনের পূর্ণ ব্যবহার এখনই করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ শেষ হলে দেশের তেল পরিশোধনের ক্ষমতা আরও ৩০ লাখ টন বৃদ্ধি পাবে, তখন এসপিএমে আনা অতিরিক্ত তেলের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। যদিও উক্ত দ্বিতীয় ইউনিটটির কাজ পুরোদমে শেষ হতে আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat