বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের প্রায় ২৬ মিলিয়ন (২ কোটি ৬০ লাখ) শিক্ষার্থীর শিক্ষার গুণগত মান যুগোপযোগী ও উন্নত করার লক্ষ্যে ৩শ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ।
‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ শীর্ষক বিশেষ এই কর্মসূচির মূল আওতার মধ্যে রয়েছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং কোমলমতি শিশুদের বয়স ও শ্রেণি উপযোগী পঠন, লিখন ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে শক্তিশালী সহায়তা প্রদান করা। মূলত সরকারের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-5) সফলভাবে বাস্তবায়নে এই তহবিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আজ শনিবার (৭ নভেম্বর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে জানানো হয়।
বিশ্বব্যাংক তাদের মূল্যায়নে জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা বর্তমানে অন্যতম বড় একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশই তাদের বয়সোপযোগী একটি সহজ পাঠ সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম নয়। তুলনামূলকভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ায় এই হার ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে এই প্রসঙ্গে বলেন, “একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ও দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রায় সব শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। নতুন এই অর্থায়ন শিশুদের আরও ভালোভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে এবং ক্লাসে টিকিয়ে রাখতে (ড্রপআউট কমাতে) বিশেষভাবে সহায়তা করবে, যা পরবর্তীতে তাদের কর্মজীবনে উন্নত সুযোগ পাওয়ার শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেবে।”
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি শিক্ষাকட்டামো। যেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত বিভিন্ন স্কুল, কিন্ডারগার্টেন এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধারায় দুই কোটিরও বেশি শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। নতুন এই কর্মসূচির আওতায় শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষাদান সামগ্রী সরবরাহ, কাঠামোবদ্ধ পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক পেডাগজিক্যাল প্যাকেজ চালু করা হবে। এর পাশাপাশি, এই প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জন্য বিশেষ নেতৃত্ব বিষয়ক (লিডারশিপ) প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সামগ্রিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে আরও সুসংহত করা হবে।
কর্মসূচির সার্বিক লক্ষ্য ও এর সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এডুকেশন স্পেশালিস্ট ও টিম লিডার তাশমিনা রহমান জানান, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য একটি শক্তিশালী মৌলিক শিক্ষাক্রম অত্যন্ত অপরিহার্য পদক্ষেপ। দেশের কোনো শিশুই যাতে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে না পড়ে, তা সুনিশ্চিত করতে এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রতিষেধকমূলক (রেমেডিয়াল) শিখন সুবিধা প্রদান করা হবে। বিশেষ করে যে জেলাগুলো শিক্ষার মানের দিক থেকে তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে রয়েছে, সেগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। সেই সাথে এই কর্মসূচি শিক্ষক ও স্কুল নেতৃত্বের বিকাশ, বাজেটের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং তথ্যভিত্তিক সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
নতুন এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোতে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত বিষয়ে মানসম্মত পাঠদানের জন্য শিক্ষকরা যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ লাভ করবেন। একই সাথে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে, যা শিশুদের বিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই পড়ালেখায় একটি শক্ত ভিত্তি গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। আশা করা হচ্ছে, এই দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির সুবাদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৮ লাখ ৪৩ হাজারেরও অধিক নতুন এবং তুলনামূলক উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও বেতনযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পুরো তহবিল প্রদান করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্যতম অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), যা সাধারণত বিশ্বের উন্নয়নশীল ও নিম্ন-আয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ২৫ বছর মেয়াদি এই ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা আসল পরিশোধে ছাড়ের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।