×
সদ্য প্রাপ্ত:
নোয়াখালীতে আ.লীগ নেতার বাড়িতে ভূরিভোজ, ওসি প্রত্যাহার লঘুচাপের প্রভাবে দেশের ৮ জেলায় বজ্রবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা “মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির তাণ্ডবে কুপোকাত রাজধানী” ইউরোপে রুশ ‘হাইব্রিড হামলার’ হুমকি বেড়েছে: ম্যাক্রোঁ বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য: ড. তিতুমীর রাজধানীতে নাশকতা ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার,২০০'র বেশি চেকপোস্ট: ডিএমপি সৌদির রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কতা জারির পর শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ ৪৯৫ উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ : ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জনের প্রাণহানি ফের বন্ধ চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড
  • প্রকাশিত : ২০২৬-০৯-২০
  • ২৬ বার পঠিত


বাংলাদেশ যখন এক কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং শিল্পায়ন ও গ্রামীণ জনপদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে কয়লাভিত্তিক ও বড় প্রকল্পগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সাম্প্রতিক সময়ে নানা যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় দফায় দফায় বিঘ্ন ঘটেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ মালিকানাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট বা রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আকস্মিক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টার পর সম্প্রতি প্লান্টটির উৎপাদন পুনরায় চালু হয়েছে, যা জাতীয় গ্রিডে স্বস্তির বাতাস বয়ে এনেছে।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় অবস্থিত এই বৃহৎ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন প্রক্রিয়া হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল গত ১৩ সেপ্টেম্বর। প্লান্ট সংশ্লিষ্ট কারিগরি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি প্রধান উৎপাদন ইউনিটে হঠাৎ করে মারাত্মক প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে প্লান্টের জেনারেশন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং একপর্যায়ে পুরো ইউনিটের উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন প্রকৌশলীরা।

একটি ১৩২০ মেগাওয়াটের মতো মেগা প্রজেক্টের একটি সম্পূর্ণ ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অস্থিরতা দেখা দেয়, যা সাধারণ গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিগত ৭২ ঘণ্টা ধরে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং কারিগরি টিমের দিনরাত নিরলস পরিশ্রম, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং যন্ত্রাংশ মেরামতের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। গত রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) থেকে প্লান্টটি পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুনরায় সচল হওয়াটা বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং কয়লা আমদানির জটিলতার কারণে দেশের বেশ কয়েকটি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছিল। এর ফলে দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল।

রামপালের মতো মেগা প্রজেক্ট থেকে দৈনিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় দেশজুড়ে চলা এই বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকাংশে কমে এসেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, রামপালের উৎপাদন চালুর ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলো এখন অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে এবং হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজতর হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল সাময়িক মেরামত করে এই ধরনের মেগা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ও নিখুঁত প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স বা প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা চলে আসছে। সুন্দরবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এই মেগা প্রজেক্টের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে পরিবেশবাদীরা সবসময় সোচ্চার ছিলেন।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, এই প্লান্টে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরিবেশ দূষণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করবে। তা সত্ত্বেও, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে কার্বন নিঃসরণ, ছাই বা অ্যাশ ম্যানেজমেন্ট এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসনের উচিত এই ধরনের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত নিরীক্ষা (Environmental Audit) পরিচালনা করা এবং পরিবেশ রক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক জ্বালানি যেমন গ্যাস, কয়লা এবং জ্বালানি তেল আমদানির ওপর দেশের অর্থনীতি অস্বাভাবিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সামান্য ওঠানামাই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলশ্রুতিতে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয় বা ভর্তুকির বোঝা সামলাতে হিমশিম খেতে হয় সরকারকে।

রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর নিরবচ্ছিন্ন চালুর বিষয়টি সরাসরি নির্ভর করে নির্দিষ্ট মানের কয়লার নিয়মিত আমদানির ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ঋণপত্রের (LC) জটিলতার কারণে অতীতেও কয়লা সংকটের মুখে পড়েছিল এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল কয়লা বা আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুৎ) এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। খুলনা, বাগেরহাট, যশোরসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে বড় ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে পারেনি।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি সচল থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক জোনগুলোতে শিল্পায়নের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কুটির শিল্প থেকে শুরু করে মাঝারি ও ভারী শিল্প কারখানোগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার পথ সুগম হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বেকারের সংখ্যা কমবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তবে এজন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের টেন্ডার ও গ্রিড লাইনের আধুনিকায়নও সমানভাবে জরুরি, যাতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কোনো অপচয় ছাড়াই সরাসরি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে।

একটি মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক হলেও বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটা প্লান্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও কারিগরি দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রামপাল প্রকল্পের পরিচালনা পর্ষদ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত অবিলম্বে একটি স্থায়ী মনিটরিং সেল গঠন করা, যা যেকোনো ছোটখাটো ত্রুটি বড় আকারে ধারণ করার আগেই তা নিরাময় করতে সক্ষম হবে।

পাশাপাশি, দেশি প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে যদি স্থানীয়ভাবে কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করা যায়, তবে যেকোনো সংকটকালে দ্রুততম সময়ে তা সমাধান করা সম্ভব হবে।


নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat