বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর বেপরোয়া বাণিজ্য আবারও প্রকট আকার ধারণ করেছে। নগরীর বিভিন্ন অভিজাত রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডের দোকান এবং খাবার হোটেলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পচা, বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এই ঝটিকা অভিযানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ভেজাল উপাদান ব্যবহারের দায়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার মোট ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম যখন নগরীর বিভিন্ন জনপ্রিয় ও ব্যস্ততম খাবার হোটেল এবং রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে প্রবেশ করে, তখন সেখানে চরম অরাজক ও নোংরা পরিবেশ দেখতে পায়। ফ্রিজের ভেতর কাঁচা মাংস ও মাছের সঙ্গে দিনের পর দিন আগের তৈরি পচা ও বাসি খাবার একসঙ্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল ক্ষতিকর কেমিক্যাল, পোড়া তেল এবং খোলা ও অস্বাস্থ্যকর মসলা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ ক্রেতাদের স্বাস্থ্যের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ভোক্তাদের সঙ্গে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি করায় তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয় এবং অবিলম্বে রান্নাঘরের পরিবেশ উন্নত করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন মোড়ে পরিচালিত এই ধারাবাহিক অভিযানে আইন অমান্যকারী মোট ১৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নামিদামি রেস্তোরাঁও রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী নগদ জরিমানা করেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনে যদি কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় পচা, বাসি ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর খাবার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কেবল আর্থিক জরিমানা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো সিলগালা করে দেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে বিক্রি হওয়া এই ধরনের পচা ও বাসি খাবার গ্রহণের ফলে সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। টাইফয়েড, ডায়রিয়া, খাদ্য বিষক্রিয়া (Food Poisoning) এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির জটিল রোগের মূল কারণ হিসেবে এই অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে।
প্রশাসন এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে শুধু জরিমানা বা অভিযান নয়, বরং নগরবাসীর সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। হোটেল বা রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সময় সাধারণ নাগরিকদেরও নিজ দায়িত্বে পরিবেশ ও উপকরণের মান যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।