যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাই-লেভেল জেনারেল ডিবেট। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু সংকটের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রথম ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ভাষণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্প, জাতীয় স্বার্থ এবং জনমুখী সংস্কারের রূপরেখা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে এটি তার প্রথম জাতিসংঘ সফর।
ভাষণে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে:
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ অব্যাহত রাখার জোরালো দাবি জানানো হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর যে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে, তা বিশ্বনেতাদের পুনর্বিবেচনা করার তাগিদ দেওয়া হবে।
জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অভিযোজন: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করবে। বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তির হস্তান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলায় ‘ লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল দ্রুত ছাড় করার জোরালো দাবি উত্থাপন করা হবে।
অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব: চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটার প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও কর্মমুখর এই সফরে কেবল সাধারণ পরিষদের ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না সরকারপ্রধান। প্রথাগত দীর্ঘ বিদেশ সফরের ধারা ভেঙে অত্যন্ত সীমিত বহরের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন তিনি। সফরসূচি অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
কুয়েতের যুবরাজ, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ভুটান, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং জনশক্তি রপ্তানির মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতির সঙ্গেও তার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
সাধারণ পরিষদের মূল ভাষণের পাশাপাশি নিউইয়র্কে বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক ইভেন্টে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে অস্তিত্বের সংকটে পড়া দ্বীপ ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সুরক্ষায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। এছাড়া বৈশ্বিক বৈষম্য নিরসন এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন প্রশংসনীয় উদ্যোগ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে বাংলাদেশ আয়োজিত কয়েকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তিনি।
বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গতি আনা এবং দেশের তরুণ সমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এরই অংশ হিসেবে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে এসব বৈঠকে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের এই প্রথম এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রযাত্রাকে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।