×
সদ্য প্রাপ্ত:
একনেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন ফুলগাজীতে প্রবাসীর জমিতে আগুন, শতাধিক ফলের গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ এক গোল, দুই অ্যাসিস্টে মেসির রাজকীয় বিদায় ভিজিএফ কার্ড এর মাধ্যমে ২০ কেজি চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু: মাহদী আমিন দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিন ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল শাহজালাল বিমানবন্দরে দুই বিমানকর্মীর জুতায় মিলল ৯ কেজি স্বর্ণ শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে: দীনেশ ত্রিবেদী চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল চালাবে বিদেশি অপারেটর, খসড়া চুক্তি অনুমোদন সংরক্ষিত এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আসন শূন্য ঘোষণা
  • প্রকাশিত : ২০২৬-১০-০৭
  • ১০ বার পঠিত
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন 
প্রণয় দাশগুপ্ত শিমুল । চট্টগ্রাম ব্যুরো

হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে উঠেছে শান্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। গত তিন-চার মাস ধরে নগরী জুড়ে জ্বর, সর্দি, কাশি ও গায়ে ব্যথার রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নগরীর হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে এখন শুধু রোগীদের আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারি। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের কর্মচারীরা।

সোনালি কন্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক চিত্র। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ইতিমধ্যে নগরীর ৮টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চকবাজার, বাকলিয়া, কোতোয়ালী, হালিশহর, পতেঙ্গা ও চান্দগাঁও এলাকার কিছু অংশ। এই আটটি ওয়ার্ড থেকেই সবচেয়ে বেশি রোগী আসছে বিভিন্ন হাসপাতালে।

ন্যাশনাল হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই
নগরীর ব্যস্ততম এলাকা মেহেদীবাগে অবস্থিত চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতাল এখন ডেঙ্গু রোগীদের প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু সেখানেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দুটি ভবনের প্রতিটি ফ্লোর, প্রতিটি কেবিন, ওয়ার্ড এবং করিডোর রোগীতে ভরপুর। হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগে একটি বেডও খালি নেই। অনেক রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন একটি সিটের আশায়। হুইল চেয়ারে, প্লাস্টিকের চেয়ারে, এমনকি মেঝেতে বসেও অনেকে স্যালাইন নিচ্ছেন।

একজন ভুক্তভোগী জানান, "আমার মায়ের গত ৫ দিন ধরে জ্বর। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ। তিনটি হাসপাতাল ঘুরে ন্যাশনালে এসেছি। কিন্তু এখানেও সিট নেই। ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলেছেন।"

হাসপাতালের একজন সিনিয়র নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "গত ১৫ বছরে এমন রোগীর চাপ দেখিনি। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেও কুলাতে পারছি না। প্রতিদিন ১৫০-২০০ জন জ্বরের রোগী আসছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশেরই ডেঙ্গু পজিটিভ আসছে।"

শুধু ন্যাশনাল নয়, সবখানেই একই চিত্র
ন্যাশনাল হাসপাতাল ছাড়াও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক), চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, পার্কভিউ, ম্যাক্স, মেট্রোপলিটন, সার্জিস্কোপসহ নগরীর কোনো বেসরকারি ক্লিনিকেই একটি সিট খালি নেই। চমেকের মেডিসিন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী ভর্তি আছে। মেঝেতে, বারান্দায় রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক - প্রথম আলো, সমকাল ও দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি রোগী।

প্রতি পরিবারে রোগী: মরার উপর খাঁড়ার ঘা
নগরীর বাস্তবতা হলো - এমন কোনো পরিবার নেই যেখানে একটি মানুষও জ্বরে আক্রান্ত নয়। জ্বর, সর্দি, গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা - এই উপসর্গগুলো দিনের পর দিন লেগে আছে। রক্ত পরীক্ষা করলেই ধরা পড়ছে ডেঙ্গু।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, একটি পরিবারে একজন সুস্থ হতে না হতেই আরেকজন আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। ডেঙ্গু পরীক্ষা, ডাক্তারের ফি, ওষুধ এবং হাসপাতালের খরচ মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দিশেহারা। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।

কেন এই হঠাৎ বিস্ফোরণ?
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:

১. থেমে থেমে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা: এবার বর্ষায় থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে আছে। ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করেছে।
২. তাপমাত্রা বৃদ্ধি: মাঝখানে অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক মানুষ হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা রোগীর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
৩. জনসচেতনতার অভাব: এখনো অনেকেই জমে থাকা পানি পরিষ্কার করছেন না।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খবর প্রতিদিনকে জানায়, "গত কয়েক মাসে সর্দি-কাশি ও জ্বরের রোগী অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ব্লাড পরীক্ষা করার পর বেশিরভাগই ডেঙ্গু পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি না হঠাৎ করে কিভাবে এত ডেঙ্গু রোগী বেড়ে গেল।"

তারা আরও বলেন, "আমরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে ব্যস্ত। রোগীদের সেবার ক্ষেত্রে আমরা বিন্দু পরিমাণ গাফিলতি করছি না। তবে সিট সংকটের কারণে আমরা খুব হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। একটি সিটও খালি নেই, প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সাধ আছে, সাধ্য নেই। তারপরও আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"

এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ বিপর্যয়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুশান্ত বড়ুয়ার মতে, পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকলে চট্টগ্রামে ভয়ংকর এক মানবিক বিপর্যয়ের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তিনি বলেন, শুধু হাসপাতালের সিট বাড়ালেই হবে না, উৎসে মশা মারতে হবে।

নগরবাসীর দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা, প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠন করা, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালু করা এবং সিট সংখ্যা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তা না হলে শান্ত চট্টগ্রাম আরও অশান্ত হয়ে উঠবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat