সিলেট প্রতিনিধিঃ
সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্মম নির্যাতনে রায়হান আহমদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান অভিযুক্ত বরখাস্তকৃত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই রায়ে অপর দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি তিনজনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী আলোচিত এই মামলার রায় প্রকাশ করেন। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত ছয়জন আসামির মধ্যে কেবল পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি পাঁচজন আসামিই বর্তমানে আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন।
আদালতের সংশ্লিষ্ট সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, প্রধান আসামি আকবর হোসেন ভূঁইয়ার প্রাণদণ্ড ছাড়াও কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ এবং টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের এসআই মো. হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী ও স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুল আল মামুনকে (নোমান) সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন বিচারক। ঘোষিত এই রায়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুমিনুল ইসলাম। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর প্রয়োজন মনে করলে উচ্চ আদালতে আপিল করা হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে আদালতের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালত কক্ষে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘আদালতের এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন মূল অপরাধী আকবরকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে আমরা পূর্ণ বিচার পাব এবং আমার সন্তান রায়হানের আত্মাও শান্তি পাবে।’
তবে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক থাকায় তীব্র শঙ্কা ও হতাশা ব্যক্ত করেন সালমা বেগম। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আজ তো রায় শুধু কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকল। আসামিরা তো গ্রেপ্তার হয়ে শাস্তি ভোগ করছে না। তারা শাস্তি না পেলে আমার বিগত ছয় বছরের নিরবচ্ছিন্ন আইনি লড়াই ও মানসিক কষ্ট পুরোটাই বৃথা হয়ে যাবে।’
ঘটনার পেছনের ইতিহাস: উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে সিলেট নগরের কাষ্টঘর এলাকা থেকে রায়হানকে আটক করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে এনে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এর পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযোগ ছিল, ফাঁড়িতে নির্যাতন চলাকালে এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল দিয়ে রায়হানের স্বজনদের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষের টাকা দাবি করা হয়েছিল। এই নৃশংস ঘটনার পরদিন ১১ অক্টোবর নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পরপরই সিলেট মহানগর পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত দল পুলিশি হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর বিষয়টি সত্য বলে নিশ্চিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ অক্টোবর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে মামলার সার্বিক তদন্তের ভার তুলে দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর।
ঘটনার পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া প্রধান আসামি আকবরকে ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর রাতে ভারতের দনা বস্তি এলাকা থেকে স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন আটক করে। পরদিন তাঁকে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের হাতে সমঝে দিলে পুলিশ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখায়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৫ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেন আদালতে প্রায় ১,৯০০ পৃষ্ঠার বিশদ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। চার্জশিটে অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন পুলিশ সদস্য। তাঁরা হলেন—এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশিদ। অন্য আসামি আব্দুল আল নোমানের (মামুন) বিরুদ্ধে আলামত হিসেবে ফাঁড়ির সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়।
পরবর্তী সময়ে গত বছরের ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন প্রধান আসামি আকবর। পরদিন ১১ আগস্ট সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হয়েই তিনি পুনরায় পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। রায়হানের পরিবারসহ সর্বস্তরের মানুষ অন্য আসামিদেরও একইভাবে পলাতক থাকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।