নরিন জাহান, জেলা প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ :
একসময় যেখানে শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত চারপাশ, যেখানে পরিবারের সঙ্গে একটু আনন্দঘন সময় কাটাতে ছুটে আসতেন নগরবাসী, যেখানে রঙিন রাইড আর সবুজের সমারোহে খুঁজে পাওয়া যেত নাগরিক জীবনের একটুখানি স্বস্তি—সেই চৌরঙ্গী পার্ক আজ শুধুই ধ্বংসস্তূপ।
নারায়ণগঞ্জের খানপুর বরফকল ঘাট সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা চৌরঙ্গী ফ্যান্টাসি ইকো পার্কের গল্পের শুরু ২০১৪ সালে। সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে ওঠে নগরবাসীর পরিচিত একটি বিনোদনকেন্দ্র। ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান পার্কটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইকোপার্ক হিসেবে উদ্বোধন করেন।
শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন রাইড, খোলামেলা পরিবেশ, গাছপালা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে পার্কটি ছিল নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝে একটু স্বস্তির জায়গা। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে জায়গাটি ছিল আনন্দের এক পরিচিত ঠিকানা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেল সেই পরিচিত দৃশ্যপট।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআইডব্লিউটিএর খানপুরে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ও বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য পার্কের জায়গাটি নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে পার্কটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীরা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে পার্কটি সংরক্ষণের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পার্কটি অক্ষত রেখেও বিকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই দাবি আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
গত ৪ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএর প্রকল্পের জন্য পার্কের স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। যে জায়গায় একসময় শিশুদের পদচারণা, আনন্দ আর পরিবারের মিলনমেলা বসত, সেখানে এখন ভাঙা স্থাপনা আর ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন।
একটি বাণিজ্যিক ও নৌপরিবহন অবকাঠামো প্রকল্প হয়তো দেশের অর্থনীতি এবং নদীপথের পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। কিন্তু সেই উন্নয়নের পাশাপাশি নগরবাসীর বিনোদন, শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং পরিবেশের জন্য উন্মুক্ত জায়গা রাখার বিষয়টিও কি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে?
নারায়ণগঞ্জ একটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পনগরী। এখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। অথচ একটি পরিচিত বিনোদনকেন্দ্র হারিয়ে গেলেও তার বিকল্প হিসেবে নতুন কোনো শিশু পার্ক বা উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুস্পষ্ট উদ্যোগের খবর এখনো সামনে আসেনি।
চৌরঙ্গী পার্ক হয়তো আর আগের রূপে ফিরবে না। কিন্তু এই পার্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য পরিবারের স্মৃতি, শিশুদের আনন্দঘন মুহূর্ত এবং নগরবাসীর স্বস্তির জায়গাটুকু কি এত সহজে মুছে ফেলা সম্ভব?
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়নের পরিকল্পনায় মানুষের বিনোদন, শিশুদের শৈশব এবং পরিবেশের অধিকারও যেন হারিয়ে না যায়।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা—চৌরঙ্গী পার্ক হারিয়ে গেলেও শিশুদের জন্য নতুন একটি আধুনিক, নিরাপদ ও সবুজ বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কারণ, একটি শহর শুধু কলকারখানা, টার্মিনাল আর কংক্রিটের অবকাঠামো দিয়ে গড়ে ওঠে না; একটি সুন্দর শহর গড়ে ওঠে তার মানুষের হাসি, শিশুদের আনন্দ এবং নির্মলভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়ে।
এ জাতীয় আরো খবর..