দীর্ঘ দুই দশকের স্থবিরতা, অবহেলা ও কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার ফলে দেশের পর্যটন খাত যে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এই সম্ভাবনাময় খাতটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবার দেশি-বিদেশি বিশাল বিনিয়োগ আকর্ষণের এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পথে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের (এটিএফ) জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে পর্যটন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যার আওতায় সারা দেশে ইতোমধ্যে চিহ্নিত ১ হাজার ৪৯৮টি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তর করার জন্য একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
এই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে এবং দেশে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার এখন সরাসরি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করছে, যেখানে বিশ্বের খ্যাতনামা আবাসন ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুর্জ খলিফা নির্মাণকারী 'ইমার প্রোপার্টিজ'-এর মতো গ্লোবাল জায়ান্টদের দেশের পর্যটন সুবিধা উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলমান রয়েছে এবং সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতে বিপুল বিনিয়োগের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
পর্যটন খাতকে কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে সরকার এই খাতে প্রায় ২৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার এক অভাবনীয় বিনিয়োগের মেগা পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের বর্তমান অবদান ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে উন্নীত করে আগামীতে তা ৬ থেকে ৭ শতাংশের একটি সম্মানজনক মাইলফলকে নিয়ে যাওয়া।
একই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে আইসিসিবিতে চলমান তিন দিনব্যাপী এশিয়ান ট্যুরিজম মেলায়, যেখানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০টি দেশের দুই শর বেশি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান, যেমন—হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, এয়ারলাইনস ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে তাদের উদ্ভাবনী পর্যটন পণ্য, দেশ-বিদেশ ভ্রমণের আকর্ষণীয় প্যাকেজ এবং বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত তুলে ধরছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটন অংশীজনদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন রচনা করছে।
মাত্র ৩০ টাকা প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এই মেলায় হাওর, সুন্দরবন, নৌ ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের পাশাপাশি ইকো ও কমিউনিটি ট্যুরিজমকে বিশেষভাবে হাইলাইট করা হচ্ছে এবং আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্রর মাধ্যমে বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক এয়ার টিকিটসহ নানা পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে পর্যটনমুখী করতে ব্যাপক উদ্দীপনা জোগাচ্ছে।
সর্বোপরি, দেশের পর্যটনকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমে পরিণত করতে এবং বাংলাদেশকে বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে একটি অন্যতম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পরিণত করতে সরকারের এই বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ—যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বিশ্বমানের ব্র্যান্ডিং—প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এবার দীর্ঘদিনের স্থবির পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন অর্থনীতিতে এক নীরব কিন্তু দৃশ্যমান বিপ্লব ঘটানোর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র জাতির জন্য এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে।