মোঃ অলি উদ্দিন মিলন
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার হলেও দেশে তা বর্তমানে পদে পদে ভোগান্তি ও বাণিজ্যিকীকরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকের ফি, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা ও ঔষধের বাজারে তীব্র নৈরাজ্যের কারণে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত রোগীরা দিশেহারা।
চিকিৎসক-রোগী অনুপাত ও জনবল সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১,০০০ জন জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত ১ জন চিকিৎসক এবং প্রতি ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স থাকা আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশে এই অনুপাত চরমভাবে ভারসাম্যহীন। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আধুনিক অবকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে সেবা মিলছে না। অ্যানাস্থেটিস্ট ও টেকনিশিয়ানের তীব্র সংকটের কারণে অনেক সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার (OT) ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU) বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
অনিয়ন্ত্রিত ফি ও কমিশন বাণিজ্য
বেসরকারি খাতে চিকিৎসকদের ভিজিট বা ফি নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে যে যাঁর ইচ্ছেমতো ফি নিচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চিকিৎসকদের নেওয়া টেস্ট কমিশন ও রেফারেল ফি। ফলে অপ্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল টেস্ট করিয়ে রোগীদের অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা হচ্ছে।
কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অপচয়
টিআইবি (TIB) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম (যেমন: আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর, এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান মেশিন) ক্রয়ে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত দর দেখিয়ে বাজেট অপচয় করা হয়। দেখা গেছে, কেনা যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ স্রেফ সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকনিশিয়ানের অভাবে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা অধিকাংশ পরিবার কোনো না কোনো পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বা ঘুষ দিতে বাধ্য হন।
ফার্মাসিউটিক্যাল সিন্ডিকেট ও ঔষধের দামের তাণ্ডব
রোগীদের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের (Out-of-Pocket Expenditure) একটি বড় অংশ চলে যায় ঔষধ কেনায়। ব্র্যান্ডেড ঔষধের প্রসারে অসাধু কিছু কোম্পানি চিকিৎসকদের অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জেনেরিক বনাম ব্র্যান্ডের দামের তফাত: একই জেনেরিক নাম (Generic Name) বা রাসায়নিক উপাদানের ঔষধ হওয়া সত্ত্বেও ব্র্যান্ডভেদে মূল্যের পার্থক্য অনেক বেশি।
বিনামূল্যের সরকারি ঔষধ পাচার: সরকারি হাসপাতালে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত বিনামূল্যে বিতরণের ঔষধের একটি অংশ অসাধু চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে বাইরের ফার্মেসিতে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
জরুরি সংস্কারে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
ফি ও টেস্টের মূল্য নির্ধারণ: অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের ভিজিট এবং বেসরকারি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা। জেনেরিক প্রেসক্রিপশন বাধ্যবাধকতা: আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ব্র্যান্ডের বদলে ঔষধের মূল উপাদান বা জেনেরিক নাম লেখার নির্দেশ দেওয়া। কেনাকাটায় স্বচ্ছতা: সরকারি স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ই-জিপি (e-GP) নিশ্চিত করা এবং ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর (DGDA) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) নিয়মিত তদারকি বাড়ানো। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার: উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা।
স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি কার্যকর ও বৈষম্যহীন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর মনিটরিং এবং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দাবি।
এ জাতীয় আরো খবর..