শেষ পর্ব | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন*
চট্টগ্রাম ব্যুরো | প্রণয় দাশ গুপ্ত শিমুল
চট্টগ্রাম মহানগরীতে এখন সন্ধ্যা নামা মানেই আতঙ্ক। দিনের আলোয় যে শহর কর্মচঞ্চল, সন্ধ্যার পর সেই শহরেরই গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। মোবাইল, ভ্যানিটি ব্যাগ, স্বর্ণের চেইন ছিনতাই থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে ইভটিজিং - সবকিছুর নেপথ্যে একটাই নাম, মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং। অভিযোগ উঠেছে, কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এই গ্যাং এখন প্রশাসনকেও তোয়াক্কা করছে না।
▪️১০টি মৃত্যুফাঁদ চিহ্নিত*
দৈনিক আজাদী, সমকাল, পূর্বকোণসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত গত তিন মাসের ৪৫টি ঘটনা বিশ্লেষণ ও সরেজমিন অনুসন্ধানে নগরীর ১০টি স্থানকে সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো - ইপিজেড মোড়, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট, ওয়াসা মোড়, জিইসি, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও নতুন ব্রিজ মোড়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি স্পটে ৭-৮ জনের ২-৩টি গ্রুপ ভাগ করে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এদের হাতে থাকে চাপাতি, ছুরি, ক্ষুর, এন্টি-কাটার, বাইকের চেইন ও লোহার রড। দিনের বেলায় তারা এলাকায় আড্ডা দেয়, ফেসবুকে টিকটক করে, আর সন্ধ্যার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ভুক্তভোগীরা জানান, কৌশলটাও একই রকম। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও নতুন ব্রিজ এলাকায় চলন্ত বাস থেকে নামার সময় যাত্রীদের মোবাইল ও ব্যাগ টান দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রিকশায় থাকা নারী যাত্রীদের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের। নিউ মার্কেট ও আগ্রাবাদ এলাকায় অফিস ফেরত মানুষজন সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। জিইসি ও ২ নম্বর গেট এলাকায় প্রাইভেটকার বা রিকশায় বসে মোবাইল ব্যবহার করার সময় জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে।
▪️শিউরে ওঠার মতো দুটি ঘটনা*
ঘটনা-১: মুরাদপুরে ছুরিকাঘাতে কলেজ ছাত্র:* গত সপ্তাহে মুরাদপুরে রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রাম কলেজের এক ছাত্রের মোবাইল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। তিনি বাধা দিলে কিশোর গ্যাংয়ের ৩ সদস্য তাকে এলোপাতাড়ি ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীদের বয়স ১৭-১৮ বছরের বেশি হবে না, কিন্তু তাদের হিংস্রতা ছিল ভয়াবহ।
ঘটনা-২: ২ নম্বর গেটে ছাত্রীকে ইভটিজিং:* ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় একটি বেসরকারি কলেজের দুই ছাত্রী কোচিং থেকে ফেরার সময় ৫-৬ জন কিশোর তাদের পিছু নেয় এবং অশালীন মন্তব্য করতে থাকে। তারা প্রতিবাদ করলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং একজন ছাত্রীর ওড়না ধরে টান দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে বখাটেরা পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় ওই এলাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
▪️কেন এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি?*
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি সূত্র জানায়, এসব অপরাধের ৮০ ভাগের সাথে জড়িত মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এরা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। ইয়াবা, গাঁজা ও ড্যান্ডির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এই কিশোররা কাউকে ভয় পায় না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসব কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে স্থানীয় কিছু চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া। তারা এই কিশোরদের ব্যবহার করে মাদক বিক্রি ও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও আইনের ফাঁক দিয়ে তারা দ্রুত বেরিয়ে আসে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
▪️নগরবাসী কী চায়?*
নগরবাসী এখন চরম উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। তাদের দাবি, শুধু কিশোরদের ধরলে হবে না, তাদের গডফাদারদের ধরতে হবে।
নগরবাসীর দাবি ৪টি -
১. চিহ্নিত ১০টি হটস্পটে পুলিশের স্থায়ী টহল ও চেকপোস্ট বসাতে হবে।
২. সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।
৩. কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার ও মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ছেড়ে না দিয়ে কাউন্সেলিং ও সংশোধনাগারে পাঠাতে হবে।
পুলিশ বলছে, তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত এক মাসে ৪৩ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু নগরবাসী বলছে, শুধু আটক নয়, দৃশ্যমান শাস্তি চাই। অন্যথায় চট্টগ্রাম মহানগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
এ জাতীয় আরো খবর..