×
সদ্য প্রাপ্ত:
তাহসিফ হত্যা মামলায় আবারও ৩ দিনের রিমান্ডে দীপ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন: গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত সব পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা তাহসিফ সউরি হত্যা মামলায় ৪ দিনের রিমান্ডে দীপ পুলিশের ছয় কর্মকর্তাকে বদলি তুরাগে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন মোড়, ঘটনাস্থলের কাছেই মিলল মোটরসাইকেল মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলাঃ মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড
  • প্রকাশিত : ২০২৬-১১-০২
  • ৪১ বার পঠিত
​মোঃ অলিউদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি: 

বিশ্ব ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে আটলান্টিক থেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (Indo-Pacific Region) স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সমুদ্র বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। এই ভূরাজনৈতিক খেলায় বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লোভনীয় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে জাপানের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এবং চীনের প্রভাববলয় সীমিত করার কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের নতুন গবেষণার খোরাক জুগিয়েছে।

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে সংবিধানের শান্তিবাদী ধারা মেনে সামরিক ও কৌশলগত আগ্রাসী ভূমিকা থেকে দূরে ছিল জাপান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসী সম্প্রসারণ নীতি—বিশেষ করে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বন্দর ও অবকাঠামো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রবণতা—টোকিওকে তাদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্মূলভন করতে বাধ্য করেছে।

​​সমুদ্র বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ​আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রেখে কোনো একটি দেশের একক আধিপত্য ঠেকানো।

​বঙ্গোপসাগর হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত তেল ও পণ্য পরিবহনের প্রধান সামুদ্রিক রুট। এই জলপথে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) সুরক্ষিত রাখতে জাপান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে গভীর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ।

​কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়নাধীন গভীর সমুদ্র বন্দর ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম অবকাঠামোগত উদ্যোগ। জাপানি দাতা সংস্থা জাইকা (JICA)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় গড়ে ওঠা এই মাতারবাড়ী হাবকে বিশ্লেষকরা কেবল একটি বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন আনার হাতিয়ার। মাতারবাড়ীতে বড় আকারের মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) সরাসরি ভিড়তে পারবে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের গতি ও সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।এই বন্দরটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, নেপাল এবং ভুটানের মতো ভূবেষ্টিত অঞ্চলগুলোর জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট বা লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করতে পারে। 

চীন মাতারবাড়ী বা এর আশপাশের অঞ্চলে নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালালেও জাপানের দৃঢ় উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাতারবাড়ী প্রকল্প চীনকে বঙ্গোপসাগরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার থেকে নিবৃত্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জবাব।

​বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই সম্পর্ক কেবল দাতা-গ্রহীতার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ (Strategic Partnership) রূপ নিয়েছে।

জাপান বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (SEZ) বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আড়াইহাজারের বাংলাদেশ-জাপান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে সংলাপ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাকা ও টোকিও সমমনা মিত্র হিসেবে কাজ করছে।

মেট্রো রেল প্রকল্প থেকে শুরু করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল—বাংলাদেশের রূপান্তরে জাপানি প্রযুক্তির অবদান অনস্বীকার্য।

​দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ (BRI-এর অধীনে বিভিন্ন প্রকল্প), অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানের সমন্বিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি—এই দুই পরাশক্তি ব্লকের প্রতিযোগিতার মাঝখানে বাংলাদেশ এক দারুণ কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান যেভাবে অর্থনৈতিক সহায়তার আড়ালে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তুলছে, তাতে আগামী দিনে এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চীনকে এককভাবে কোনো ব্লকে আধিপত্য বিস্তার করতে না দিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু সহযোগিতাপূর্ণ বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টোকিও এবং ঢাকার এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত দূরদর্শী ভূমিকা পালন করবে।

​সংক্ষেপে বলা যায়, মাতারবাড়ী বন্দর এবং জাপানি বিনিয়োগ কেবল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠিই নয়, এটি বঙ্গোপসাগরে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার এবং মুক্ত বাণিজ্যের পথ সুগম করার এক ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক কৌশল।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat