নিজস্ব প্রতিবেদক:
নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডের ওপর বর্তমান সরকারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এই বোর্ড মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের সাথে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক, গ্রহণযোগ্য ও ন্যায়সংগত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করবে।
আজ বুধবার সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মালিক, শ্রমিক এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। আয়োজিত এই ত্রিপক্ষীয় সভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, অতীতে সাধারণত পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন করার বিধান থাকলেও এবার শ্রমজীবী মানুষের দিক বিবেচনা করে তিন বছর পূর্ণ হতেই নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোর্ডের প্রথম বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্বিতীয় বৈঠকটিও দ্রুততম সময়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি নভেম্বর ও আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সবপক্ষের সাথে আলোচনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডিসেম্বর মাসের ভেতরেই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বোর্ড। এ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমরা শতভাগ বিশ্বাস করি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবশ্যই শ্রমিকদের সার্বিক স্বার্থ, পোশাক শিল্পের সুরক্ষা এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।’
তৈরি পোশাক খাতের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা মালিক, শ্রমিক ও সরকারের যৌথ অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে এবং তৈরি পোশাকশিল্পের অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের রপ্তানিমুখী এই পোশাক খাতের অগ্রযাত্রায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাহদী আমিন আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশে বিশ্বখ্যাত তৈরি পোশাকশিল্পের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসননামলে এই সম্ভাবনাময় খাতের ব্যাপক অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটে। সেই একই সোনালী ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকারও তৈরি পোশাক খাতের যুগোপযোগী উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সার্বিক কল্যাণ রক্ষায় অবিচলভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আকুল আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, আজকের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মালিক, শ্রমিক ও সরকারি প্রতিনিধিদের মাঝে যে চমৎকার সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা প্রতিটি শিল্প কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশেও বজায় থাকা জরুরি। বৃহস্পতিবার (আগামীকাল) থেকে দেশের সব পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজ নিজ কাজে যোগদান করবেন বলে সরকার শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করছে। তবে কারখানা চালু রাখার পাশাপাশি নতুন মজুরি বোর্ডের সাথে নিয়মিত সংলাপ, পরামর্শ ও আনুষ্ঠানিক আলোচনা যথারীতি অব্যাহত থাকবে।
একই সাথে তৈরি পোশাক খাত নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও অভিযোগ জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, শান্তিকামী সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে কিছু চিহ্নিত বহিরাগত চক্রান্তকারী অনুপ্রবেশ করে নানা উসকানি ও কৃত্রিম উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার ফলে আমাদের নির্দোষ ও সাধারণ শ্রমিকদের তাজা রক্ত ঝরছে।
এমন নাজুক পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সাথে নিজেদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে এবং শিল্পাঞ্চলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে বলে সরকার দৃঢ় বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনে শ্রমজীবী মানুষের অবিসংবাদিত অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোটি কোটি শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড বিশ্বমঞ্চে অনন্য মর্যাদায় সমাদৃত হয়েছে। বর্তমান সরকার সর্বদা সর্বোচ্চ স্নেহ ও গভীর মমত্ববোধ নিয়ে শ্রমজীবী মানুষের পাশে অবস্থান করবে। একই সাথে নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডও পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সময়োপযোগী মজুরি বাস্তবায়ন করবে বলে সরকার বিশ্বাস করে।
বক্তব্যের শেষাংশে এই উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক জাতীয় সংগ্রামে শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনেও তাঁদের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও ভূখণ্ডে আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় পরিচয়—আমরা সবাই বাংলাদেশি। তাই মতভেদ ভুলে দেশ পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক এই যাত্রায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।