বিশেষ প্রতিনিধি:
আগামী দুই-এক মাসের ভেতরেই দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য একটি সম্মানজনক ও নতুন নিম্নতম মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, শ্রমজীবী মানুষের যৌক্তিক দাবি-দাওয়াগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতিমধ্যে একটি নিবেদিত মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং তারা ইতোমধ্যে তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ঐতিহ্যবাহী বাগেরহাটের হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব আশার কথা জানান।
পথসভায় তারেক রহমান আশ্বস্ত করে বলেন, ‘ইতিমধ্যে গঠিত নতুন মজুরি বোর্ড তাদের সার্বিক মূল্যায়ন ও আলোচনার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী দুই-এক মাসের মধ্যেই মজুরি বোর্ড পোশাক খাতের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করবে, যাতে করে আমাদের খেটে খাওয়া শ্রমিক ভাই-বোনেরা আগের চেয়ে আরও উন্নত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করতে পারেন।’
আয়োজিত পথসভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের উৎপাদনশীল শিল্পকারখানায় যেকোনো ধরনের হামলা, ভাঙচুর এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ শ্রমিকসহ আপামর জনগণকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শিল্পকারখানায় বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পেছনে যারা দেশবিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মতোই দেশের সাধারণ জনগণ তাদেরকে সমুচিত জবাব দেবে।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমরা আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক শক্তি এক করে দেশের সাধারণ মানুষ, মেহনতি শ্রেণী ও সর্বস্তরের শ্রমিক ভাই-বোনদের সাথে নিয়ে এই ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াব। ২০২৪ সালে যেভাবে বাংলাদেশের আমজনতা চক্রান্তকারীদের উচিত জবাব দিয়েছিল, আগামী দিনেও ঠিক একইভাবে তাদেরকে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’
বিগত শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে যারা এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারেনি, জনগণের ভোটাধিকার নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছিল এবং দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছিল—তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এখন সেই পরাজিত অপশক্তি সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নেড়ে দেশে চরম অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি মিল-কারখানা এ দেশের সাধারণ জনগণ ও খেটে খাওয়া শ্রমিকদের নিজস্ব সম্পদ। এই উৎপাদনশীল কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়বেন আমাদের শ্রমজীবী মানুষ এবং তাঁদের কোমলমতি সন্তানেরা; থমকে যাবে তাঁদের ভবিষ্যৎ। তাই চক্রান্তকারী ও উসকানিদাতাদের কোনো ধরনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এখন বিভেদ নয়, বরং দেশ পুনর্গঠন ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মোক্ষম সময়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার দেশের বিদ্যমান সংকট নিরসন, দ্রুত শিল্পের প্রসার ঘটানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। বিএনপি পূর্বে জনগণের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় চালুর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার এখন তা বাস্তবায়নে কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে সারা দেশে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের পথ সুগম করা হবে।
অঞ্চলের শিল্প ঐতিহ্য স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, একসময় খুলনা ছিল গোটা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। তবে কালক্রমে সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এ অঞ্চলের বহু ঐতিহ্যবাহী কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় সীমান্ত পর্যন্ত হাজার হাজার নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
উল্লেখ্য, এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলায় অবস্থানকালে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ' কর্তৃপক্ষ ও চীনের বিখ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন' (সিআরসিসি)-এর মধ্যে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মোংলা বন্দরের মেগা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
কাটাখালীর বিশাল পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত সম্পন্ন করেন এবং বিকেলে খুলনার জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করেন।