ঠাকুরগাঁও জেলায় ১০৫টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ৬টি বৈধ লাইসেন্সধারী, আর বাকি ৯৯টি ইটভাটা চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। এসব ইটভাটার কার্যক্রমের ফলে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, এবং স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় , অবৈধ ইটভাটাগুলোতে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ইট তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জমির উর্বরতা ধ্বংস করছে। এছাড়া, ইট পোড়ানোর জন্য কাঠ ও খড়ি ব্যবহার করায় বনাঞ্চলও হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে জেলার গাছের সংখ্যা কমছে এবং বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে। ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের এলাকার বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয়দের শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, এলার্জি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত করছে। শিশু ও বৃদ্ধরা এসব রোগে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন।
এদিকে, জনসাধারণের অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ ইটভাটাগুলো নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য একটি চক্র নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে। ফলে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই এসব অবৈধ ইটভাটা চালু রয়েছে।
সারা দেশে চলমান অবৈধ ইটভাটা বন্ধে হাইকোর্ট কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সব অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনারদের তলব করেছেন। আগামী ১৭ মার্চ তাদের স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ, আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তানিম খান ও আসাদ উদ্দিন।
২০২২ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) নামক মানবাধিকার সংগঠন দেশের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে। শুনানি শেষে ১৩ নভেম্বর আদালত অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর, ২৮ নভেম্বর বিভাগীয় কমিশনারদের এই আদেশ কার্যকর করতে বলা হয়। অবৈধ ইটভাটাগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায়, হাইকোর্টে সম্পূরক আবেদন করা হলে নতুন করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ আসে। সাধারন মানুষের মতে অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশদূষণ কমানো এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে অবৈধ ইটভাটাগুলোর দ্রুত উচ্ছেদ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ নয়, বরং বিকল্প পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপনেও সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে এবং হাইকোর্টের এই রায়ের পর প্রশাসনের ভূমিকা কী হয়, তা এখন দেখার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে।