মিজানুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার, টঙ্গী গাজীপুরঃ
জাতীয় অর্থনীতি, ঐতিহ্যবাহী শিল্প খাতের বেহাল দশা এবং দেশের সার্বিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের সচেতন মহলে যে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আক্ষেপের সৃষ্টি হয়েছে, তা বর্তমান সময়ের এক নির্মম ও বাস্তব চিত্র। পাট, চিনি, চা এবং চামড়া শিল্পের দীর্ঘস্থায়ী পতন এবং দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাকশিল্পের ওপর নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অস্থিরতা জাতীয় অর্থনীতিকে আজ এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট ও সংবাদবিশ্লেষকদের মতামত এবং সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠার আলোকে এই বহুমাত্রিক সংকট ও তা থেকে উত্তরণের একটি সুসংহত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ ও শিল্পগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতি ও নীতিগত অবহেলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত সমভাবে দায়ী।
চামড়া শিল্প ও অব্যবস্থাপনা: একসময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত চামড়া আজ সিন্ডিকেট, সঠিক সংরক্ষণাগার বা ট্যানারি জোনের দীর্ঘসূত্রিতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দরকষাকষির দুর্বলতার কারণে চরম সংকটাপন্ন। যে চামড়া অতীতে উচ্চমূল্যে বিক্রি হতো, তার দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে শুধু বহির্বিশ্বের বাজার দখল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ নজরদারির অভাব ও অব্যবস্থাপনা প্রধানত দায়ী।
পাট ও অন্যান্য ঐতিহ্য: ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাট একসময় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান পরিচয় হলেও ভুল নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর দুর্নীতি ও সময়োপযোগী আধুনিকায়নের অভাবে সেই বাজার আজ হাতছাড়া হয়েছে। সঠিক সময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশ আমাদের কাঁচামাল কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে লাভবান হয়েছে।
২. পোশাকশিল্প ও বর্তমান সংকট: আত্মঘাতী ভাঙচুরের সংস্কৃতি
পোশাকশিল্প (RMG) বর্তমানে দেশের অর্থনীতির মূল লাইফলাইন। লাখ লাখ নারী শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জীবনজীবিকা এই খাতের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল।
ভাঙচুর ও সহিংসতার খেসারত: কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় বা আবেগের বশে কারখানায় ভাঙচুর চালানো হলে কোনো বিশেষ মালিকের ক্ষতি হয় না; বরং সরাসরি ধ্বংস হয় সাধারণ গরিব শ্রমিকের রুটিরুজি। বিদেশি ক্রেতারা (Buyers) যখন নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বোধ করেন, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো বিকল্প দেশগুলোতে অর্ডার সরিয়ে নেন।
দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন: উৎপাদনের চালিকাশক্তিতে আঘাত হানার অর্থ নিজেদের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির বাহনটিতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটের সমাধান কখনো দেশের উৎপাদন খাতকে অচল করে হতে পারে না।
বাংলাদেশ বর্তমানে যে ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছেন। মেগা প্রকল্পের নামে অপব্যয়, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি দেশকে একধরনের মারাত্মক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে বন্দী করে ফেলেছে। নীতিনির্ধারক ও আমলাদের দেশপ্রেম এবং জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের প্রবণতা আইনের শাসন ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বর্তমান বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তি পেতে আবেগসর্বস্ব ও ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে কিছু সুনির্দিষ্ট ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও অর্থনীতি: রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে যেন অর্থনীতির মূল প্রাণকেন্দ্র (পোশাকশিল্প ও কৃষি) কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বলি না হয়। কারখানায় বা রাজপথে সহিংসতা রোধে কঠোর আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
শিল্পের বহুমুখীকরণ (Diversification): শুধু পোশাকশিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি (ICT), কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ (Agro-processing) এবং পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কাঁচামাল কাঁচা অবস্থায় রপ্তানি না করে দেশেই তা থেকে ফিনিশড গুডস (Finished Goods) তৈরির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন: রাষ্ট্রীয় তহবিল অপচয় রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণ জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তুলতে হবে।
নাগরিক সচেতনতার জাগরণ: রাষ্ট্র মানে শুধু সরকার বা নির্দিষ্ট কোনো নেতা নয়—রাষ্ট্র মানে দেশের প্রতিটি নাগরিক। শিক্ষায় কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
উপসংহার: জাতি হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই আত্মোপলব্ধির সময়। আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না; রাষ্ট্র পরিচালনা করতে প্রয়োজন মেধা, শৃঙ্খলা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও সুশাসন। সময় এসেছে সকল ক্ষোভকে শক্তিতে রূপান্তর করার এবং ধ্বংসের পথ পরিহার করে নির্মাণের নতুন শপথ নেওয়ার।