ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারকে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার সম্পর্কিত সম্পূর্ণ বিবরণী:
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-কে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে প্রেসিডিয়ামের জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে তিনি পরিষ্কার করেন যে, রেহানা সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নন।
সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশে ফেরা, নিজের নিরাপত্তা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে ফেরা ও নিরাপত্তা আশঙ্কা শেখ হাসিনা জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে হত্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেক মানুষের জীবনের ঝুঁকি আছে। দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে আমি কাউকেই বিপদে ফেলতে চাই না”। সরকারের কাছে ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছাড়া কীভাবে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “দেশটা আমার। আমার বাবা এ দেশকে স্বাধীন করেছেন। ছোটবেলা থেকে এই দেশেই মানুষ হয়েছি, স্কুলজীবন থেকে রাজনীতি করেছি। সেখানে আমার দেশে আমাকে কেন ফিরতে দেওয়া হবে না?” বিএনপি সরকার তাকে ফেরত দেওয়াসংক্রান্ত যে কথা বলছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ফেরত দেওয়ার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন ফেরত কেন, আমি নিজেই যাব”। পরিস্থিতি বুঝে অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও দেশের পরিস্থিতি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ও আবেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “আমার দেশে যা ঘটছে তা দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়”। অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৬ লক্ষ মামলা দেওয়া হয়েছে এবং দেশে সব চিহ্নিত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের দেশত্যাগের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, হেলিকপ্টারে ওঠার পর সীমান্ত পার হওয়া পর্যন্ত তিনি জানতেন না যে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বরং তিনি ভেবেছিলেন তাকে টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে।
জঙ্গিবাদ ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে বলে অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। এই অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যাহত করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের উত্থানের মাশুল ভারতকেও দিতে হবে”। ভারত সরকারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ভারত কী ভেবে বাংলাদেশের নির্বাচন সমর্থন করেছে এবং তারেক রহমানকে ফিরিয়ে এনেছে, তা ভারত সরকারই ভালো বলতে পারবে। দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে সামরিক জোটের চেয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তারেক রহমানের সমালোচনা বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি বিদেশে বসে রাজনীতি করেছেন, যা তিনি কখনো বাধা দেননি। তাই দিল্লি থেকে তার কথা বলা নিয়ে কথা ওঠার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি, তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে দর-কষাকষির প্রক্রিয়াটিকে তিনি দেশের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা জানান, তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং ডিসেম্বরের বিজয়ের মাসকেই তিনি দেশে ফেরার উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।