সারাদেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি বুলেটিন অনুযায়ী, হাম এবং হাম-পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত সারা দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,০২২ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদদের মতে, মৃতের সংখ্যা এত বিপুল হওয়ার পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
টিকাদানের ঘাটতি: পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় চরাঞ্চল এবং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে টিকাদানের সার্বিক হার আশঙ্কাজনকভাবে কম ছিল। নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ব্যাহত হওয়া ও কিছু ক্ষেত্রে অসচেতনতার কারণে একটি বড় শিশুগোষ্ঠী টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
জটিল উপসর্গ ও বিলম্বে চিকিৎসা: হামের কারণে শিশুদের শরীরে তীব্র জ্বর ও ফুসকুড়ি ছাড়াও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও কান কান পাকা এবং মারাত্মক অপুষ্টি তৈরি হচ্ছে। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের রোগীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে দেরি করায় এবং সঠিক পুষ্টি উপাদানের অভাব থাকায় মৃত্যুর হার বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ভিটামিন-এ ঘাটতি: হাম প্রতিরোধ ও চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো 'ভিটামিন-এ' ক্যাপসুল। যেসব শিশুর ভিটামিন-এ-এর তীব্র ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হামের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পাশাপাশি প্রাণহানির ঝুঁকিও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
| সূচক / বিবরণ | তথ্য ও পরিস্থিতি |
| মোট নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা | ১,০২২ জন (অধিকাংশই শিশু) |
| সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল | পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওড় অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও নগর বস্তি |
| প্রধান মৃত্যুর কারণ | হাম-পরবর্তী তীব্র নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা |
| হাসপাতালে ভর্তি রোগী | কয়েক হাজার শিশু বর্তমানে নিবিড় ও সাধারণ চিকিৎসাধীন |
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। গৃহীত জরুরি পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ:
বিশেষ আউটরিচ ও ক্র্যাশ টিকাদান ডাইভ: আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা (MR) টিকার বিশেষ ‘ক্র্যাশ ড্রাইভ’ শুরু করা হয়েছে।
জরুরি ভিটামিন-এ বিতরণ: আক্রান্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সকল শিশুকে অনতিবিলম্বে দুই ডোজ ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইসোলেশন ও বিশেষ ওয়ার্ড গঠন: সকল জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের আলাদাভাবে চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড ও অতিরিক্ত শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে মেডিক্যাল টিম: দুর্গম এলাকাগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য বিশেষ জরুরি মেডিক্যাল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের প্রতি জরুরি বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে, শিশুদের শরীরে উচ্চ তাপমাত্রা বা জ্বরের সাথে চামড়ায় লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে, দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কবিরাজি বা কুসংস্কারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল খাবার, ভিটামিন এবং স্যালাইন সেবন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।