মোঃ অলি উদ্দিন মিলন ঢাকা
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ওষুধমুক্ত জীবন' ও কিটো ডায়েটের বার্তা ছড়িয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা চিকিৎসক ডা. জাহাঙ্গীর কবির এবং তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠান 'হেলথ রেভল্যুশন লিমিটেড'-কে ঘিরে প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরালো হয়েছে। অপচিকিৎসা, রোগীর মৃত্যু, ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার এবং অনুমোদনহীন সাপ্লিমেন্ট বিক্রির সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অভিযোগের ভিত্তিতে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠান 'হেলথ রেভল্যুশন লিমিটেড' এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইনসুলিন বন্ধ করে কিটো ডায়েট ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ অনুসরণ করার পর এক ডায়াবেটিক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এর প্রেক্ষিতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামানকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিকিৎসা পরামর্শের ধরন এবং ওই রোগীর মৃত্যুর পেছনে কোনো সরাসরি যোগসূত্র ছিল কি না, তা যাচাই করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিগ্রি বিতর্ক ও বিএমডিসির শোকজ নোটিশ
এফসিপিএস ডিগ্রি সম্পন্ন না করেও নামের পাশে তা ব্যবহার করার অভিযোগে বিএমডিসি তাঁকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠায়। বিএমডিসি আইন ২০১০ অনুযায়ী, অনুমোদনহীন ডিগ্রি ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ, যার সাজা সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ভোক্তা অধিকারের অভিযান ও সাড়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা
আফতাবনগরে অবস্থিত ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের ব্যবসায়িক কেন্দ্র ‘আলটিমেট অর্গানিক লাইফ’ ও 'হেলথ রেভল্যুশন'-এ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে। অনুমোদনহীন ওষুধ ও সম্পূরক খাদ্য সংরক্ষণ এবং অন্য ব্র্যান্ডের পণ্য এনে নিজস্ব মোড়কে ‘অর্গানিক’ নামে পুনরায় প্যাকেজিং করে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় তাঁকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযোগের জবাবে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের বক্তব্য
বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর ভিডিও বার্তা ও আইনি যোগাযোগের মাধ্যমে ডা. জাহাঙ্গীর কবির তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন:
তদন্তের চিঠি প্রসঙ্গ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে সরাসরি তাঁর নাম নেই, বরং তাঁর প্রতিষ্ঠান 'হেলথ রেভল্যুশন' এর নাম রয়েছে।
ইনসুলিন বন্ধের অভিযোগ নাকচ: সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসাপত্রে ইনসুলিন বন্ধ করার কোনো পরামর্শ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ডিগ্রি বিতর্ক: তিনি কখনোই নিজ প্রেসক্রিপশনে এফসিপিএস লেখেননি; প্রতারক চক্র বা ভুয়া পেজ তাঁর ছবি ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়াতে পারে বলে দাবি তাঁর।
লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান: বিএমডিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কারণ দর্শানোর চিঠির বিপরীতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত ও আইনি নথি জমা দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল হেলথ প্র্যাকটিসে নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে চিকিৎসা পরামর্শ ও নিজস্ব বাণিজ্যিক পণ্য বিপণনের এই ধরন চিকিৎসাসেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্ম ও হেলথ ইনফ্লুয়েন্সারদের কাজের স্পষ্ট আইনি সীমা নির্ধারণ, রোগী সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অনলাইন অপচিকিৎসা বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (ডিজিডিএ) আরও কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ জাতীয় আরো খবর..