মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিবেদন, ঢাকা:
দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা কিংবা তৃণমূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে, তা কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক পচন ও বিচারিক সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ধর্ষণ, যৌতুক, যৌন হয়রানি এবং গার্হস্থ্য সহিংসতার মতো ঘটনা প্রতিদিন ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে 'মব কালচার' বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি দেশের সামগ্রিক আইনি ও সামাজিক কাঠামোকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার পাহাড় জমলেও নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত মন্থর। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে চূড়ান্ত রায় পেতে বছর পার হয়ে এক দশক পর্যন্ত লেগে যায়।
মানসিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি: দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার খরচ চালাতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
সাক্ষীর অভাব ও বিচারহীনতা: সময়ের সাথে সাথে আইনি লড়াইয়ের স্পৃহা হারিয়ে যায়, সাক্ষীরা ভয় বা প্রভাবে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফলে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়।
গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে গুরুতর অপরাধ হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা অসাধু রাজনীতিকদের সহায়তায় অনানুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা বা ‘ধেন দরবার’ বসানো হয়।
সমঝোতার নামে মুখ বন্ধ: ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি বা সামাজিক একঘরে করার হুমকি দিয়ে অল্প টাকায় আপস করতে বাধ্য করা হয়।
অপরাধীর সুরক্ষা: আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, যা সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী বা সরকারি বিরোধী দলের লোক হলে পুলিশি তদন্ত ব্যাহত হওয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে বিলম্ব ও দুর্বল চার্জশিট: ক্ষমতার চাপে অনেক সময় দুর্বল এজাহার ও চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়বারের মতো লাঞ্ছনা: মামলা চলাকালীন ভুক্তভোগী ও তার পরিবার সমাজে প্রতিনিয়ত কটূক্তি, মানসিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির মুখোমুখি হন।
নতুন আতঙ্ক:মব কালচার’ ও সংঘবদ্ধ সহিংসতা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জেলা-উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনা বা গুজবকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণহানি: জায়গা-জমির বিরোধ, সামান্য বাকবিতণ্ডা বা মিথ্যা সন্দেহের জেরে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে।
আইনের শাসনের চরম অবনতি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে বা নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এই ‘মব জাস্টিস’ বা মব কালচার জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
সহিংসতা ও অন্যায়ের খবর যখন দেশবাসীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়, তখন সংবাদকর্মীরাই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন।
তথ্য সংগ্রহে বাধা: থানা বা প্রত্যন্ত এলাকায় নারী নির্যাতন কিংবা মব কালচারের তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে গেলে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
ক্যামেরা ও ফুটেজ ছিনতাই: প্রমাণ মুছে ফেলতে সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভেঙে ফেলা, আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
গতিশীল ট্রাইব্যুনালনির্দিষ্ট সময়সীমার (যেমন: ১৮০ দিন) মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে বিচারকের সংখ্যা ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করা।
সংবেদনশীল পুলিশি সেবাথানায় নারী ও শিশুবান্ধব ডেস্ক কার্যকর করা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
মব কালচারে জিরো টলারেন্সআইন হাতে তুলে নেওয়া প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
সাংবাদিক ও সাক্ষীর সুরক্ষাসাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে বিশেষ সেল গঠন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের আইনি সুরক্ষা প্রদান।
প্রযুক্তিগত সাক্ষ্য গ্রহণডিজিটাল প্রমাণ, ডিএনএ টেস্ট ও ভিডিও ফুটেজকে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা বিধান করা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মানদণ্ড। বিচারহীনতার এই অন্ধকার দূর করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সাথে সাধারণ সমাজকে মব কালচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফেরাতে হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..