পর্দায় শান্ত স্বভাব, দায়িত্বশীলতা ও গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে দর্শকদের মনে এক অন্যরকম মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর ‘আবু বকর’ চরিত্রটি। কেবল পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়, এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকদের মধ্যেও।
বিশেষ করে নারী দর্শকদের একটি বড় অংশ এই চরিত্রটিকে একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং বাস্তবেও এমন কাউকে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। কিন্তু কী এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই চরিত্রে, যা দর্শকদের এতটা বিমোহিত করেছে?
জনপ্রিয় এই ধারাবাহিকটিতে ‘আবু বকর’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন পাকিস্তানি অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার। সম্প্রতি বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কের জনপ্রিয় উপস্থাপক হারুন রশিদের সঙ্গে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন দুর্বলতা এবং প্রেমের নানাদিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
শেহরিয়ারের মতে, আবু বকরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সে সবসময় চারপাশের সবাইকে খুশি রাখতে চায়। কাউকে কোনো কিছুতে ‘না’ বলতে পারার অক্ষমতাও তার অন্যতম একটি সমস্যা। অভিনেতা জানান, বাস্তব জীবনে নিজের সঙ্গেও এই চরিত্রের বেশ মিল রয়েছে। অনেক সময় অন্যদের খুশি করতে গিয়ে তিনিও নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে যান।
এ ছাড়াও আবু বকরের চরিত্রের মধ্যে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ কাজ করে—অর্থাৎ অন্যের যেকোনো সমস্যার সমাধান করা কিংবা সবাইকে যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করার এক ধরনের অতিরিক্ত প্রবণতা তার মধ্যে রয়েছে।
চরিত্রটির এই ধরনের মানসিক গঠন ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার পেছনে তার মায়ের একটি গভীর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন অভিনেতা শেহরিয়ার। ছোটবেলা থেকেই আবু বকরের মা তাকে নির্দিষ্ট কিছু নৈতিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে লালন-পালন করেছেন এবং সবসময় শিখিয়েছেন কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল। ফলে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সব সময় নিখুঁত বা সঠিক কাজটি করার এক ধরণের অদৃশ্য মানসিক চাপ সবসময় তার ওপর কাজ করে।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেহরিয়ার বলেন, ‘একবার ভেবে দেখুন তো, এই মানুষটিকে প্রতিদিন কতখানি মানসিক চাপ ও টেনশন নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়!’
পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর আবু বকর চরিত্র ও অভিনেতা শেহরিয়ারের ভাবনা
সাক্ষাৎকারে আবু বকর ও জারিয়াবের মধ্যকার রোমান্টিক প্রেমের গল্প নিয়েও কথা বলেছেন অভিনেতা। তাঁর ভাষ্যমতে, জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের ভালো লাগা বা অনুভূতির সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। মায়ের সঙ্গে জারিয়াবের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াতের সময় থেকেই মেয়েটির প্রতি তার আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে সেই অনুভূতির কথা সে কখনো মুখে প্রকাশ করেনি, বরং নিরবতা বজায় রেখে আড়াল থেকেই জারিয়াবকে লক্ষ্য করত।
দুজনের ব্যক্তিত্ব ও স্বভাবের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের এই দুই মানুষের মাঝে সম্পর্কের কোনো সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আবু বকরের মনে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বও কাজ করেছিল। নিজের মন যা চাচ্ছে, বাস্তবতা হয়তো সেই পথে সহজে এগোনোর সুযোগ দেবে না—এমন ভাবনাও তাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াত।
জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের গভীর ভালো লাগার বিষয়টি দর্শকদের কাছে আরও স্পষ্ট করতে নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যে বেশ কিছু সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বা ক্লু রেখেছিলেন অভিনেতা শেহরিয়ার। এমনই একটি দৃশ্যের স্মৃতিচারণ করে অভিনেতা জানান, একবার দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় আবু বকর জারিয়াবকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, ‘তুমি পাস্তা পছন্দ করো, তাই না?’ তখন জারিয়াব ভীষণ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল সে এই তথ্য কীভাবে জানল। জবাবে আবু বকর সাফ জানিয়েছিল, ‘কিশওয়ার খালা একবার এ কথা বলেছিলেন।’
শেহরিয়ারের মতে, কাউকে মানসিকভাবে গভীরভাবে ভালো না বাসলে তার পছন্দের খাবারের মতো ছোটখাটো ও তুচ্ছ বিষয় এভাবে মনে থাকার কথা নয়। দর্শকদের কাছে আবু বকরের সুপ্ত মনের কথাগুলো সুন্দরভাবে পৌঁছে দিতে তিনি অভিনয়ে এমন আরও অনেক প্রতীকী ইঙ্গিত ছড়িয়ে রেখেছিলেন। অভিনেতার ভাষায়, ‘আমি এ রকম আরও অনেক ছোট ছোট ইঙ্গিত রেখেছি।’
উল্লেখ্য, ধারাবাহিকটি সম্প্রচারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু বকরকে নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক। তার এই অতিরিক্ত ভালো মানুষি দেখে অধিকাংশ দর্শক মুগ্ধ হলেও, কারও কারও কাছে আবার চরিত্রটির আচরণ কিছুটা অবাস্তব বলেও মনে হয়েছে।
তবে এই প্রসঙ্গে এর আগে মুখ খুলেছিলেন অভিনেত্রী নাদিয়া আফগান। তিনি আবু বকরের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিলেন, তাঁর নিজের স্বামীর মধ্যেও এই চরিত্রের মতো বেশ কিছু চমৎকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই আবু বকরের আচার-আচরণ তাঁর কাছে মোটেও অবিশ্বাস্য বা অবাস্তব বলে মনে হয়নি।