নরিন জাহান, জেলা প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ:
শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন। কিন্তু জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর সড়কগুলোতে যানজট, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা এবং যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সড়ক, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত করে আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
আশার কথা, নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগব্যবস্থায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু উন্নয়ন উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। লিংক রোডের সাইনবোর্ড থেকে চাষাড়া পর্যন্ত সড়ক ছয় লেনে উন্নীত হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পঞ্চবটি-মুক্তারপুর উড়াল সড়ক, কাঁচপুরে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ এবং নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেল করিডর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এ ছাড়া গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত প্রস্তাবিত মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে যাতায়াতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
তবে শুধু সড়ক প্রশস্তকরণ, উড়াল সড়ক কিংবা নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেই পরিবহন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জনবান্ধব পরিবহন পরিকল্পনা।
ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থায় যে পরিবর্তনগুলো জরুরি
প্রথমত, নারায়ণগঞ্জ নগরীতে পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নির্দিষ্ট রুট, নির্ধারিত স্টপেজ, সুশৃঙ্খল বাস চলাচল এবং যাত্রীবান্ধব সময়সূচি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চাষাড়া, দুই নম্বর রেলগেট, সাইনবোর্ড, শিবু মার্কেট ও পঞ্চবটীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি এবং প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিরাপদ ফুটওভারব্রিজ ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, সাইকেল চলাচলের উপযোগী লেন এবং প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সড়কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও নৌপথে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পঞ্চমত, কাঁচপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আধুনিক বাস টার্মিনাল, পর্যাপ্ত পার্কিং, যাত্রী ছাউনি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং নিরাপদ অপেক্ষাকেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে। শহরের ভেতরে যেখানে-সেখানে বাস ও অন্যান্য যানবাহন দাঁড় করানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
ষষ্ঠত, পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই এবং সড়ক নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কোনো পরিবহন প্রকল্প গ্রহণের আগে নগরীর ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা, পরিবেশ এবং সাধারণ যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। এক প্রকল্পের সঙ্গে অন্য প্রকল্পের সমন্বয় না থাকলে নতুন অবকাঠামো তৈরি হলেও যানজটের স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।
ভবিষ্যতের নারায়ণগঞ্জ কেমন হওয়া উচিত?
এমন একটি নারায়ণগঞ্জ, যেখানে একজন শ্রমিক সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবেন, একজন ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক যানজটের ভোগান্তি ছাড়াই নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।
নারায়ণগঞ্জের পরিবহন খাতে চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়ন উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্পনগরীটি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
উন্নয়ন শুধু নতুন রাস্তা বা উড়াল সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই, যখন মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, সময় বাঁচবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং পরিবহনব্যবস্থা হবে সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য।
এ জাতীয় আরো খবর..