বিশেষ প্রতিবেদকঃ
বাংলাদেশ ও জাপানের সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের সম্পর্ককে যৌথ সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার জোরালো প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য জাপানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামো এবং গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব জোরদার করার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 'কান্তেই'-তে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ও জাপানের এই অংশীদারত্ব দাঁড়িয়ে আছে কয়েক দশকের পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা ও সুদৃঢ় বন্ধুত্বের ভিত্তির ওপর। আজ সময় এসেছে এই সম্পর্ককে আরও উঁচুতে পৌঁছে দেওয়ার। বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগবান্ধব সুযোগগুলো খতিয়ে দেখতে এবং আমাদের উন্নয়নের যাত্রায় অংশীদার হতে আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাতে তাঁর সরকার জাপানি সহযোগীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল আমাদের দুই দেশের জন্য একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ সম্ভব।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন এবং দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি, রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিধি বাড়াতে দুই দেশ একযোগে কাজ করতে একমত হয়েছে।’
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এই আলোচনার সামগ্রিক ফলাফল এবং পারস্পরিক অগ্রাধিকারগুলো একটি যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।
উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপানের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মনে জাপানের জন্য একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।’
তিনি বলেন, ‘শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জাপান ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার ঠিক পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী অগ্রগামী দেশগুলোর অন্যতম।’
প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপান সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। এই সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের জন্য আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
সরকারি এই সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তা প্রদর্শনের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং সে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একদম স্পষ্ট—দুই দেশের এই বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার শক্তিশালী উৎসে এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির মূলে রূপান্তর করা।’
জাপান সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, এমন একটি কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলি যা আমাদের দুই দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক গৌরবময় উত্তরাধিকার রেখে যাবে।’
এর আগে, নির্ধারিত সময়ে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৩২ মিনিটে জাপানের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় কান্তেইয়ে এসে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সানায়ে তাকাইচি। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে দুই নেতা একান্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক শুরুর আগে উভয় দেশের প্রধান নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
উল্লেখ্য, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার টোকিও পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে।
সফরের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধিদল, মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাইকার (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন।
চলती বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তৃতীয় বিদেশ সফর। এর আগে তিনি চীন ও মালয়েশিয়া সফর করেন। এছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি নিউইয়র্ক ভ্রমণ করেছিলেন।