বিশেষ প্রতিবেদক :
জমি নিবন্ধন ও মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, তথ্যের অস্পষ্টতা এবং নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও জমির দলিল সংরক্ষণ, নকল উত্তোলন ও মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে জমি ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।
দলিল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, বাড়ছে ভোগান্তি
জমি কেনাবেচার পর নিবন্ধন সম্পন্ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে মূল দলিল হাতে পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হয়। অন্যদিকে, পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট নথি খুঁজে বের করা এবং মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতেও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় সেবাগ্রহীতাদের।
বিশেষ করে হাতে লেখা পুরোনো নথি, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে সম্পাদিত দলিলের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জটিলতা জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলছে।
মালিকানা যাচাইয়ে জটিলতা, প্রতারণার ঝুঁকি
জমি কেনার আগে বিক্রেতার প্রকৃত মালিকানা, পূর্ববর্তী দলিল, নামজারি, খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং জমির ওপর কোনো মামলা বা বিরোধ রয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে ছড়িয়ে থাকা এবং সহজে সমন্বিতভাবে যাচাই করতে না পারায় সাধারণ ক্রেতাদের সমস্যায় পড়তে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ যাচাই ছাড়া জমি কেনাবেচা করলে একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, জাল দলিল, মালিকানা বিরোধ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরশীলতা
জমি নিবন্ধনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেক সেবাগ্রহীতাকে দলিল লেখক, মধ্যস্থতাকারী কিংবা তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হয়। এতে অতিরিক্ত ব্যয়, তথ্যের অসম্পূর্ণতা এবং হয়রানির অভিযোগ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সব মধ্যস্থতাকারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ একভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর দাবি
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে জমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, অনলাইন দলিল অনুসন্ধান, নথির নিরাপদ ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং দ্রুত দলিল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে নিবন্ধন অফিসে সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, আবেদন ও দলিলের অগ্রগতি অনলাইনে জানার ব্যবস্থা, সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচের স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
জমি মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই জমির মালিকানা নিবন্ধন ও হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা কোনোভাবেই দীর্ঘসূত্রতা, অস্পষ্টতা কিংবা অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রচলিত নিবন্ধন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার করা হবে। পাশাপাশি দলিল সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার কারণ অনুসন্ধান, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমি নিবন্ধন ব্যবস্থা কবে সম্পূর্ণ আধুনিক, স্বচ্ছ, দ্রুত ও জনবান্ধব হবে? জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে আর কতদিন ভোগান্তি পোহাতে হবে?
এ জাতীয় আরো খবর..