আনোয়ার হোসেন, খাগড়াছড়ি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারীদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় যা ছিল তাদের পরিচয়, স্বাবলম্বিতা ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক, সেই শিল্প এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, দাম বৃদ্ধি, যুবসমাজের আধুনিক পোশাকের প্রতি ঝোঁক এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব-এসব কারণেই এই প্রাচীন হস্তশিল্প সংকটে পড়েছে।
কোমর তাঁত কী এবং কেন এর নাম কোমর তাঁত: পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের ব্যবহার করা একটি ঐতিহ্যবাহী হস্তবয়ন পদ্ধতি। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ব্যাকস্ট্র্যাপ লুম বা ব্যাক-লোম নামে পরিচিত। তাঁতের এক প্রান্ত কোমরে দড়ি বা বেল্ট দিয়ে বাঁধা থাকে, অন্য প্রান্ত কোনো খুঁটি, গাছ বা স্থির বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বুননের সময় নারী উবু হয়ে বসেন এবং শরীরের সামনে-পিছনে নড়াচড়া করে সুতোর টানশন বজায় রাখেন। এই টানশনই সুতোগুলোকে সোজা, টানটান ও ছড়ানো রাখে-যাতে বোনার সময় সুতো জট না লাগে। কোনো যন্ত্র বা বিদ্যুৎ লাগে না। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি সাধারণ ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। কোমরে চাপ পড়ে বলেই এর নাম হয়েছে কোমর তাঁত। এই টানশন বজায় রাখার কৌশলই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মূল ভিত্তি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব নাম ও বৈশিষ্ট্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এই তাঁতের নাম ও কিছু বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। চাকমা সম্প্রদায় একে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করেছে। তারা তাঁতকে ‘বেইন’ বা ‘সজপদর’ বলে। তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন-খাদি এই তাঁতেই বোনা হয়।ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কাপড়ে রঙিন ফুলেল নকশা ও প্রকৃতি-অনুপ্রাণিত প্যাটার্ন বেশি দেখা যায়। মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমি, বম ও পাঙ্খোয়া সম্প্রদায়েরও নিজস্ব নাম ও ডিজাইন রয়েছে। সাধারণত রঙিন সুতা ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে বোনা হয়। আগে জঙ্গল থেকে রং সংগ্রহ করা হতো, এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাজারের সিন্থেটিক রং ব্যবহার হয়।এই তাঁতে ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পিনন, খাদি, থামি, রিফা-এর পাশাপাশি গামছা, লুঙ্গি, চাদর, ওড়না এবং আধুনিক পণ্য যেমন সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ব্যাগ, কুশন ও বেডশিটও তৈরি হয়।
চাকমা সম্প্রদায়ের পিনন-খাদি: চাকমা সম্প্রদায়ের পিনন-খাদি তাদের ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় পোশাক। এটি চাকমা সংস্কৃতি, পরিচয় এবং নারীদের হস্তশিল্প দক্ষতার জীবন্ত প্রতীক। পিনন নিচের অংশ। এটি একটি লম্বা, সেলাইবিহীন কাপড়ের টুকরো যা কোমরের চারপাশে স্কার্টের মতো জড়িয়ে পরা হয়। সাধারণ মাপ: দৈর্ঘ্য প্রায় ৪.৫ হাত, প্রস্থ প্রায় ২.৫ হাত। জমিন সাধারণত কালো। উপরে ও নিচে চওড়া রঙিন পাড় থাকে-লাল, গাঢ় নীল, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি। বাম পাশে লম্বালম্বি ভারি নকশাসমৃদ্ধ অংশ থাকে, যাকে বলা হয় ‘চাবুগি’ বা ‘চাবুকী’। এটি আঁচলের মতো তোলা হয় এবং পিননের সৌন্দরে্যর মূল অংশ। অনেক সময় একে ‘চাবুগি পিনন শাড়ি’ও বলা হয়। খাদি বা হাদি উপরের অংশ। এটি একটি বড় ওড়না বা শালের মতো কাপড় যা কাঁধের উপর দিয়ে শরীরে জড়ানো হয়। সাধারণ মাপ: দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫ হাত, প্রস্থ প্রায় ২.৫ হাত। দুই প্রকার-রাঙাহাদি (রঙিন নকশাসমৃদ্ধ, ফুল-পাতা ও জ্যামিতিক প্যাটার্ন; কম বয়সী নারীরা বেশি পরেন) এবং চিবিকটানা হাদি (সাদামাটা, কম নকশা; বয়স্ক নারীরা ব্যবহার করেন)। আধুনিক সময়ে অনেকে হাদির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ পরেন, যা ঐতিহ্য বজায় রেখে আরামদায়ক করে।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের রিনাই-রিসা তাদের ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় পোশাক। এটি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরি জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক।রিনাই (বা রিগনাই) নিচের অংশ। লম্বা, সেলাইবিহীন কাপড় যা কোমরের চারপাশে স্কার্টের মতো জড়ানো হয়। জমিন সাধারণত কালো বা গাঢ় রঙের। উপরে-নিচে চওড়া রঙিন পাড় থাকে-লাল, সবুজ, হলুদ, নীল, সাদা ইত্যাদি। নকশা খুবই জটিল ও রঙিন-ফুল, পাতা, পাখি, প্রাণী ও জ্যামিতিক প্যাটার্ন।রিসা উপরের অংশ। ছোট কাপড়ের টুকরো যা বুকের চারপাশে জড়ানো হয়। এটি শুধু পোশাক নয়, সামাজিক মর্যাদা, বিবাহিত-অবিবাহিত অবস্থা ও উৎসবের প্রতীক। আধুনিক সময়ে অনেকে রিসার সঙ্গে ব্লাউজ মিলিয়ে পরেন।রিকুতু তৃতীয় অংশ-বড় ওড়না বা শালের মতো কাপড় যা কাঁধে বা শরীরে জড়ানো হয়। শীতকালে বা অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়।রং ও নকশায় প্রাকৃতিক রং (আগে গাছ-ফল থেকে) এখন সিন্থেটিক। প্রধান রং-লাল, সবুজ, হলুদ, নীল, সাদা ও কালো। নকশায় ৩২ নালের ফুলসহ বিভিন্ন ফুল, পাতা, পাহাড়-ঝরনা, প্রাণী ও জ্যামিতিক প্যাটার্ন দেখা যায়। প্রত্যেক নকশার নিজস্ব অর্থ আছে-পরিবার, গোত্র বা প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।ইতিহাস অনুসারে, চাকমাদের পিনন-খাদি ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের রিনাই-রিসা থেকে অনুপ্রাণিত। চাকমারা ‘ফাতুং রিনাই রিসা’ শৈলী গ্রহণ করে তা পিনন-খাদিতে রূপান্তরিত করেছেন। এটি শত শত বছরের পুরনো।সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বশত শত বছর ধরে কোমর তাঁত পাহাড়ি নারীদের পরিচয়, স্বাবলম্বিতা ও সংস্কৃতির অংশ। একসময় বিয়ের যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল এই তাঁতে দক্ষতা। বৈসাবি, বিজু, সাংগ্রাইসহ বিভিন্ন উৎসবে নতুন কাপড় বোনার ধুম পড়ে। নারীরা ঘরের উঠানে বসে বোনেন। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে হাটে বিক্রি করে আয় করেন।
বর্তমান সংকট দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। সুতা, রংসহ কাঁচামালের দাম বেড়েছে। যুবসমাজ আধুনিক পোশাকের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। বাণিজ্যিকীকরণ কম এবং বেশিরভাগ উৎপাদন এখনো বাড়ির উঠানেই সীমাবদ্ধ।
গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের বৈরাগী পাড়ার ববিতা ত্রিপুড়া বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে কোমর তাঁত শিখেছি। পিনন-খাদি বুনতে অনেক সময় ও ধৈর্য লাগে। একটা সেট শেষ করতে প্রায় তিন-চার সপ্তাহ লেগে যায়। আগে জঙ্গল থেকে প্রাকৃতিক রং সংগ্রহ করতাম, এখন সবকিছু কিনতে হয়। তবুও এই তাঁত আমাদের পরিচয়। যদি নতুন প্রজন্ম না শেখে, তাহলে এই ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যাবে।
সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের মুড়াপাড়া এলাকার প্রমিলা দেবী বলেন, রিনাই-রিসা বুনতে গিয়ে মনে হয়, এই সুতার টানে আমাদের সংস্কৃতি বেঁচে আছে। আগে জঙ্গল থেকে রং আনতাম, এখন সব কিনতে হয়। কাঁচামালের দাম এত বেড়েছে যে অনেক সময় হাত গুটিয়ে বসতে হয়। তরুণ মেয়েরা আর এই কাজ শিখতে চায় না। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করে, তাহলে হয়তো আমাদের এই পুরনো শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) খাগড়াছড়ির উপ-ব্যবস্থাপক মো. আলী আল রাজী বলেন, বর্তমানে বিসিকের মাধ্যমে ফ্রেম তাঁত ও গর্ত তাঁতের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু কোমর তাঁত নিয়ে আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই।
পাহাড়ের এই প্রাচীন হস্তশিল্পকে বাঁচাতে কাঁচামাল সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার কার্যকর উদ্যোগ এখনই প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
এ জাতীয় আরো খবর..