মুহাম্মদ জুবাইর, টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:
দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছে পর্যটকবাহী জাহাজ এমভি বার আউলিয়া। পর্যটকদের আগমনে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। দ্বীপে পৌঁছানোর পর পর্যটকদের মিষ্টি ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের পদচারণায় দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের আমেজ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টায় কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া। ভোর ৬টা থেকেই ঘাটে ভিড় করতে থাকেন পর্যটকেরা।
পর্যটকদের স্বাগত জানাতে পেরে দ্বীপবাসীর মুখেও দেখা যায় স্বস্তির হাসি। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, নিয়মিত পর্যটক আগমনের মধ্য দিয়ে আবারও জমে উঠবে দ্বীপের পর্যটন কেন্দ্রিক অর্থনীতি। ফিরে আসবে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কর্মচাঞ্চল্য।
মিষ্টি-ফুলে পর্যটক বরণ, আনন্দে মাতল দ্বীপ
সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। এ সময় পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে বাধা দেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘আজ ৮৩৭ যাত্রী নিয়ে এ মৌসুমের প্রথম জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলে তিনটি জাহাজ অনুমতি পেয়েছে বলেও জানা যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া, পার্টি আয়োজন ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্েযর জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ডও করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য সামগ্রী ঘাটে নির্ধারিত স্থানে রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি সাউন্ডবক্সও পর্যটকদের কাছ থেকে নিয়ে জাহাজ মালিকদের কাছে রাখা হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে চলতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, প্রথম দিন প্রায় ৮৩৭টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি নির্দেশনা এবং প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স বহন না করার বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন করা হয়েছে।
প্রথমবার সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন পর্যটক করিম মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। মৌসুমের প্রথম দিনেই দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তাঁর আনন্দ ও উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
তবে যাত্রার আনন্দের মধ্যেও ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন পর্যটক। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক জয়নাল বলেন, ‘এবারের মতো হয়রানি আগে কখনো হয়নি। অনলাইনে টিকিট কাটার পরও যদি ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ পর্যটকদের কী অবস্থা হবে? এবার সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা। আগে ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ টিকিটপ্রতি ৭০০ টাকা বেড়েছে। সবকিছুর দাম শুধু বাড়ছেই, কমছে না। এতে আমরা মর্মাহত।’
অন্যদিকে দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম মোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিন পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপ। এর জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস, এম অনিক চৌধুরী বলেন, পর্যটকেরা যেন নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে পারেন এবং দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে প্রশাসন। সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
এ জাতীয় আরো খবর..