খন্দকার মোহাম্মাদ আলী, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সারাদেশে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে চাওয়া-পাওয়ার নানা হিসাব-নিকাশ, প্রত্যাশিত দাবি-দাওয়ার মূল্যায়ন এবং রক্তঝরা সংগ্রামের নানা ঘটনা, তখন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলার দুই লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিক নীরবে-নিভৃতে গ্রামীণ পরিবেশে কর্মমুখর রেখেছেন তাঁতশিল্পকে। পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের প্রতিদিনের সংগ্রাম কর্মক্ষেত্রকে ঘিরেই। রাজনীতির হিসাব-নিকাশের বাইরে থেকে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এই অঞ্চলের তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। একসময় হাতে বোনা তাঁতশিল্পের জন্য দেশব্যাপী খ্যাতি ছিল সিরাজগঞ্জের। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হাতে চালিত তাঁতের পরিবর্তে এখন ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। বেড়েছে উৎপাদন, সম্প্রসারিত হয়েছে কর্মসংস্থান এবং মালিক-শ্রমিক উভয়ের জন্য আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা এসে বেলকুচি, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার বিভিন্ন পাওয়ারলুম কারখানায় কাজ করছেন। এসব শ্রমিকের অধিকাংশই তাঁত মালিকদের বসতবাড়িতে আবাসনের ব্যবস্থা নিয়ে মাসের পর মাস বসবাস করেন। নারী-পুরুষ মিলিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
তবে এসব শ্রমিকের জীবন-জীবিকা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে তেমন কোনো পরিকল্পনা বা কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তাদের পক্ষে কথা বলার মতো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও খুব একটা নেই। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকদের কার্যক্রম অনেকটা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক যেন একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ও নীরব ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।
এ কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের প্রধান লক্ষ্য কাজ করা, সাপ্তাহিক মজুরি পাওয়া এবং সেই অর্থ পরিবারের কাছে পাঠানো। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা কর্মের মাধ্যমে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অঞ্চলের নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা পেশাগত দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
তবে তাঁতশিল্পের এই কর্মমুখর পরিবেশকে আরও উন্নত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, তাঁত মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারিভাবে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শব্দদূষণ ,পানি দুষণ ও বায়ুদূষণমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এ শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তাঁত শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, কর্মহীন জীবন হতাশার কাফনে জড়ানো জীবন্ত লাশের মতো। কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ পরিবার ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ হিসেবে যারা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি আরও বলেন, তাঁতশিল্পের উন্নয়নে সরকার বিশেষ দৃষ্টি দিলে এখানে ব্যাপক আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানে গার্মেন্টসশিল্প যেমন ভূমিকা রাখছে, তেমনি গ্রামীণ বেকার যুবক, বৃদ্ধ, নারী ও পুরুষের জন্য তাঁতশিল্প আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।
এ শিল্পের ধারক-বাহকদের নানা সমস্যার মধ্যেও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হচ্ছে। এ জন্য তাঁত মালিকদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার প্রশংসা করতে হয়। আমরা তাঁত শ্রমিক হিসেবে এ অঞ্চলে বসবাস করলেও মালিকরা অনেক সময় অভিভাবকের মতো আমাদের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্নভাবে সহযোগিতাও করে থাকেন।
তিনি আরও জানান, শ্রমিকরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বা সাংগঠনিকভাবে অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না। মালিক-শ্রমিকের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই তারা কাজ করে যেতে চান।
তাঁত শ্রমিকদের প্রত্যাশা, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও মালিক-শ্রমিকের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এ শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প একদিন বিশ্ববাজারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
এ জাতীয় আরো খবর..