মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, ঢাকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা,লাইফস্টাইল পরিবর্তনের নির্দেশনা এবং ওষুধমুক্ত জীবন’ যাপনের আহ্বানের মাধ্যমে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন ডা. জাহাঙ্গীর কবির। তবে বিকল্প চিকিৎসা পরামর্শ প্রদানের কৌশল, লাইফস্টাইল গাইডলাইন এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে পণ্য ও সম্পূরক খাদ্য (সাপ্লিমেন্ট) বিক্রির প্রক্রিয়া ঘিরে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন। বর্তমানে দেশের চিকিৎসা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারাবাহিক তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
চিকিৎসক বনাম ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সার বিতর্ক
এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডা. জাহাঙ্গীর কবির মূলত ‘জেকে লাইফস্টাইল’ (JK Lifestyle) এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বিকল্প ধারার খাবারের পরামর্শ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামাজিক পরিচিতি গড়ে তোলেন। চিরাচরিত চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে শর্করা কমানো (লো-কার্ব ও কিটো ডায়েট), উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এবং ব্যায়ামের পরামর্শ সংবলিত তাঁর ভিডিওগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তবে মূলধারার চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ বিশেষ করে এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ তোলেন যে, একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি মূলত 'সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার' বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে স্বাস্থ্য পরামর্শ দিচ্ছেন, যা সাধারণ রোগীদের ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান ও পণ্যের অনিয়ম
রাজধানীর আফতাবনগরে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের চেম্বার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘আলটিমেট অর্গানিক লাইফ’ এবং 'হেলথ রেভল্যুশন'-এ অভিযান পরিচালনা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP)। অভিযানে দেখা যায়, অনুমোদনহীন ওষুধ ও সম্পূরক উপাদান সংরক্ষণ এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের সাধারণ পণ্য এনে নিজস্ব মোড়কে প্যাকেজিং (Re-packaging) করে 'অর্গানিক' নামে বাজারজাত করা হচ্ছিল। এসব পণ্যের যৌক্তিক কাগজপত্র ও সঠিক অনুমোদন দেখাতে না পারায় অধিদপ্তর থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং কার্যক্রম শুধরে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসির পদক্ষেপ
চিকিৎসা ক্ষেত্রে পেশাগত নৈতিকতা রক্ষা, চিকিৎসাপদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং উচ্চমূল্যে অনুমোদনহীন প্রডাক্ট প্রেসক্রাইব করার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম ও রোগীদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন পর্যবেক্ষণ করছে। একইসাথে বিএমডিসির বিধিমালা ভঙ্গের বিষয়েও ব্যাখ্যা তলব ও পর্যালোচনা চলছে।
ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের বক্তব্য ও সাফাই
গঠিত তদন্ত কমিটি ও প্রশাসনিক পদক্ষেকের ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ডা. জাহাঙ্গীর কবির। তাঁর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে সরাসরি তাঁর ব্যক্তিগত নাম নয়, বরং তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠান 'হেলথ রেভল্যুশন'-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন বা প্রয়োজনীয় ডায়াবেটিসের ওষুধ হুট করে বন্ধ করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। বিএমডিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব চিঠির যথাযথ লিখিত ও চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা ইতিমধ্যে প্রদান করা হয়েছে। মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করা এবং ওষুধনির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
অনলাইন হেলথ প্র্যাকটিস ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ প্রদান এবং সেখান থেকে বাণিজ্যিক পণ্য বিক্রির প্রবণতা বাড়ায় একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর প্রয়োজন উঠে এসেছে। অনলাইন হেলথ ইনফ্লুয়েন্সারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট বিক্রি বন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নীতি বজায় রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (DGDA) আরও কঠোর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ জাতীয় আরো খবর..