সোনালী কন্ঠ ডেস্কঃ
উত্তরবঙ্গের কৃষির প্রাণকেন্দ্র এবং দেশের অন্যতম বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ও এর আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে এক অরাজক বালু বাণিজ্য। নীলফামারীর ডিমলাসহ তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মবহির্ভূতভাবে গভীর গর্ত করে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। সরকারি কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন)ভুক্ত ও সংবেদনশীল এই এলাকার সামান্য দূরত্বের মধ্যেই ড্রেজার ও শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে নদী বুক ও তীর থেকে অবাধে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নামমাত্র নিলাম বা ইজারার আড়ালে কিংবা সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করে তা ট্রাক ও ডাম্প ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করছে। এর ফলে কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদই লুট হচ্ছে না, বরং হুমকির মুখে পড়েছে তিস্তা ব্যারেজ, এর প্রধান সেচ ক্যানেল, ফ্লাড প্রটেকশন বাঁধ এবং নদীর তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষের বসতি। দিনের পর দিন এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং ভূতাত্ত্বিক গঠনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নদীকূল ও তীররক্ষা বাঁধ ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে গভীর গর্ত করে বালু তোলার কারণে তিস্তার ভাঙনপ্রবণতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে ও অতিরিক্ত গভীরে বালু উত্তোলন করলে নদীর তলদেশে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে পানির তীব্র স্রোত সরাসরি গিয়ে আঘাত করে দুর্বল তীরবর্তী অংশে।
গত কয়েক বছরে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে যেভাবে যত্রতত্র বালু তোলা হয়েছে, তাতে শুকনো মৌসুমেও নদীভাঙনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামান্য বর্ষণ বা পাহাড়ি ঢল নামলেই নদীপারের শত শত বিঘা আবাদি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই বালুখেকো চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিবাদ করলে উল্টো প্রভাবশালী মহলের হুমকির মুখে পড়তে হয় তাদের।
চরম ঝুঁকিতে দেশের উত্তরঞ্চলের সেচ অবকাঠামো ও জনপদ
তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প এলাকা থেকে অবৈধভাবে তোলা বালু পরিবহনের জন্য প্রতিদিন ব্যবহার করা হচ্ছে শত শত ওভারলোডেড ড্রাম ট্রাক ও ভারী ডাম্প ট্রাক। এসব ভারী যানের চলাচলের কারণে সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ সড়ক, এলজিইডি ও ইউনিয়নের পাকা রাস্তাগুলো দ্রুত ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। গ্রামীণ জনপদের শান্ত পরিবেশ ধূলিমলিন হয়ে পড়েছে এবং ধুলাবালির কারণে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
পাশাপাশি, বালু পরিবহনের সুবিধার্থে নদীর পাড় ও সংলগ্ন এলাকার সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বহু গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলাকার পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখনই এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদ মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিস্তা অববাহিকায় এই অবৈধ বালু বাণিজ্যের পেছনে কাজ করছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, অসাধু ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বহুগুণ বেশি এলাকা জুড়ে বালু উত্তোলন করা হয় এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে এই লুটপাট চালানো হয়।
স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে বারবার লিখিত অভিযোগ দিলেও নামমাত্র পরিদর্শনের বাইরে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তরা উল্টো দাবি করেন যে তারা বৈধভাবে ইজারা নিয়েছেন বা প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষেই কাজ করছেন, অথচ বাস্তবে ইজারার শর্তের তোয়াক্কা না করে নদীকে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে।
তিস্তা ব্যারেজ ও এর আশপাশের সেচ অবকাঠামোগুলোকে রক্ষা করতে অবিলম্বে এই অবৈধ বালু বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে নদী রক্ষা আন্দোলনকর্মী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন উচ্ছেদ: তিস্তা ব্যারেজ ও এর সংরক্ষিত এলাকার আশপাশে পরিচালিত সমস্ত অবৈধ ড্রেজার অবিলম্বে জব্দ ও উচ্ছেদ করা।
জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ: ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে যারা নদী ও বাঁধের ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।
নিয়মিত মনিটরিং সেল গঠন: পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করে তিস্তা অববাহিকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা।
ক্ষতিপূরণ আদায়: অবৈধভাবে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নদী পরিবেশের ক্ষতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় তিস্তা অববাহিকার এই বেপরোয়া বালু সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে অবিলম্বে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এ জাতীয় আরো খবর..