বিশেষ প্রতিবেদকঃ
২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটি আন্তর্জাতিক উৎপাদন কেন্দ্র (গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) হিসেবে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর।
এই লক্ষ্য অর্জনে জাপানের শিল্প উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন শিল্পখাতে মূলধন বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের টোকিওতে অবস্থিত জেট্রো হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ প্রধান বক্তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, 'উভয় দেশের যৌথ স্বার্থ সুরক্ষায় আমি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫টি বিশেষ খাতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। খাতগুলো হলো—মোটরযান উৎপাদন, শক্তি ও জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্র, রেলপথ ও লজিস্টিকস অবকাঠামো এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদন শিল্প।'
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। তবে তা সত্ত্বেও দেশে জাপানের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের নিচেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বিগত অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৩৬ কোটি ডলার এবং বিপরীতক্রমে জাপান থেকে আমদানি করা হয়েছিল ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। ফলশ্রুতিতে দুই দেশের এই সম্পর্ককে কেবল দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে সরাসরি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে মোড় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৮ কোটিরও বেশি, যার গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর। এই সুবিশাল তরুণ ও দ্রুত প্রশিক্ষণযোগ্য যুবসমাজ দেশের প্রধান সম্পদ। প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করছেন। ফলে আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
একই সাথে দেশে দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল জনসংখ্যার চাহিদা দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে আরও বেগবান করবে। তিনি আরও যোগ করেন, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা পৃথিবীর কোনো দেশের সাথেই বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। একইভাবে জাপানি ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যসামগ্রী বাংলাদেশে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা লাভ করবে। এ ছাড়া বিনিয়োগ ব্যবস্থা, সেবার গুণগত মান এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণে একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জাপানি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলোর উত্থাপিত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ, কার্যকর অবকাঠামো এবং সহজ কাস্টমস ও কর পদ্ধতির বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের চাহিদাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এবং এগুলোর দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে।
তিনি বিনিয়োগকারীদের সুনিশ্চিত করে বলেন, ব্যবস্যায়ীদের কাজের নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কতটা জরুরি—তা আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করি। আমাদের মূল দায়িত্বই হলো সেই আস্থা ও অনুকূল পরিবেশ সুনিশ্চিত করা।
দুই দেশের জনগণের মধ্যকার আত্মিক যোগাযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে জাপানে পাড়ি জমায়। তাই সরকার তরুণদের জাপানি ভাষা শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যেন লাখো তরুণ মেধা ও কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এই যোগ্য জনশক্তি পরবর্তীতে জাপান ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেরই কর্মসংস্থানের বিপুল চাহিদা পূরণে কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।