নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিজয়নগরে অবস্থিত শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এই অভিযোগ উত্থাপন করেন।
সম্প্রতি মিরপুর এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন সংক্রান্ত এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আন্দোলনরত দলগুলোর মধ্যে প্রকৃত শ্রমিক কারা এবং কারা বহিরাগত—সে বিষয়টি গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওচিত্রের মাধ্যমেই স্পষ্ট ফুটে উঠতে পারে। মিরপুরের এই আন্দোলনের নেপথ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতাকর্মীরা জড়িত রয়েছে। বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলা ও অস্থিতিশীল করার ফন্দি এঁটেই এই মহলটি এমন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের যেকোনো দাবি ও ক্ষোভ আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করতে বর্তমান সরকার আন্তরিক। তবে সরকারের এই সদিচ্ছাকে কোনোভাবেই দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ নেই; রাষ্ট্র প্রতিটি ধাপে তার ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।
মন্ত্রী জানান, গতকাল শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার ফলপ্রসূ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী কালই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-এর শীর্ষ নেতারাও শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়েছেন। এমনকি উক্ত বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে এ বিষয় নিয়ে নতুন করে কোনো বিরোধ বা মতপার্থক্য থাকার কথা নয়।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পাওনা বকেয়া বেতন পরিশোধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালিকপক্ষের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁরা মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
মজুরি বোর্ড গঠন এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পর অপ্রয়োজনে কলকারখানায় ভাঙচুর চালানো বা কারখানা বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের নৈরাজ্যমূলক আচরণ পুরো পোশাক শিল্পকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ শ্রমিকরা ভেতরে কাজ চালিয়ে গেলেও বাইরে থেকে কুচক্রী কিছু লোক এসে তাদের অযথা উসকানি দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সময় প্রকৃত শ্রমিক ও বহিরাগত আন্দোলনকারীদের মুখোশ উন্মোচনে গণমাধ্যমকর্মীদের ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে তা জাতির সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
আরিফুল হক চৌধুরী জানান, আগামী ৭ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই সময়ে যদি কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়, তবে উৎপাদন কার্যক্রম ও রপ্তানি পণ্য সময়মতো সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো না গেলে মালিকপক্ষ অর্থপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে, যা পরবর্তীতে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করবে।
পরিশেষে, পোশাক শিল্পের চলমান স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উৎপাদন সচল রাখতে সব শ্রমিককে স্ব স্ব কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের নায্য দাবি পূরণে সরকার ও মালিকপক্ষ উভয়ই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাই দেশের বৃহত্তম এই শিল্পখাতের স্বার্থে মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
উক্ত প্রেস ব্রিফিং ও সভা সঞ্চালনা করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএ’র সহসভাপতি মিজানুর রহমান, রেজওয়ান সেলিমসহ উভয় সংগঠনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা।