নিষেধাজ্ঞা শেষের নীরব বন থেকে রাস উৎসবের ভিড়, অক্টোবর–নভেম্বরে শিকারি চক্রের তাণ্ডব; বন বিভাগের সাঁড়াশি অভিযানেও সমস্যা কমেনি, নতুন হুমকি, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং বনদস্যুতা।
এম মোহাম্মদ ওমর।
শরনখোলা বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, প্রতিদিনই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বন রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিবারের মতো এবারও আগস্ট থেকে নভেম্বরের এই তিন মাসে শরণখোলা রেঞ্জে বন বিভাগের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত ছিল। এই সময়ে অবৈধ শিকারি, বনদস্যু ও বিষধর জেলেদের কর্মকাণ্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
নিষেধাজ্ঞার শেষ আগস্ট মাসে বন ছিল শান্ত ও নীরব। মানুষের কোলাহল বন্ধ থাকায় হরিণ, বাঘ, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ বেড়ে যায়। কুমির ও ডলফিন নদীতে অবাধে চলাফেরা করতে দেখা যায়। হরিণ ও বাঘের বিচরণ লোকালয়ের সংলগ্ন এলাকায় বেড়ে যায়। তবে কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার চেষ্টা করলে বন বিভাগের নজরদারির কারণে তাদের আটক করতে হয়।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে বন পুনরায় উন্মুক্ত হলে শরণখোলা রেঞ্জে মানুষের পদচারণা বেড়ে যায়। হাজার হাজার জেলে পারমিট নিয়ে বনে প্রবেশ করে। পর্যটক, মৌয়াল, বাওয়ালি এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের বেকারত্বের পর কর্মব্যস্ততা ফিরে পায়। তবে আনন্দের সঙ্গে কিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটে। ২৯ সেপ্টেম্বর তেঁতুলবাড়িয়া ও হয়লাতলা এলাকায় বনদস্যু শরীফ বাহিনী পাঁচ জেলেকে অপহরণ করে। পরে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মুক্তি পায়।
অক্টোবর ও নভেম্বর,এই দুই মাসে শিকারি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১১ অক্টোবর কচিখালী অভয়ারণ্যের দুধেজো খাল থেকে চারজন অবৈধ জেলে আটক হয়। ১০ নভেম্বর কটকা ও কস্তুরির খাল এলাকা থেকে শিকারি সরঞ্জাম ও ফাঁদসহ আরও পাঁচজন আটক করা হয়।
নভেম্বরের শুরুতে সুন্দরবনের দুবলার চরে ঐতিহ্যবাহী রাস পূর্ণিমা উৎসবকে কেন্দ্র করে শিকারি চক্র গভীর রাতে বনে প্রবেশ করে। বন বিভাগের টহল দল ৯ হাজার ৪১০ ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করে। এই সময় ২২টি জীবন্ত চিত্রল হরিণ উদ্ধার করা হয় এবং পুনরায় বনে অবমুক্ত করা হয়। এছাড়া একটি বন্য শুকর এবং একটি বানরও ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ৩ নভেম্বর। শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার আলোরকোলের ডিমের চর এলাকায় টহল দিতে গিয়ে সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব শিকারিদের হামলার শিকার হন। বন বিভাগের অভিযানে রাফি হাসান, শহীদ মল্লিক ও আলামিন আকুঞ্জি নামে তিন হামলাকারীকে আটক করা হয়। এর আগে ১ নভেম্বর কোকিলমনি টহল ফাঁড়ির হোন্দল এলাকা থেকে বন বিভাগের পতাকা ব্যবহার করে ট্রলার নিয়ে শিকার করতে আসা সাতজনকে হাতেনাতে ধরা হয়। এছাড়া ২৬ নভেম্বর মংলা উপজেলা থেকে আখতার বিশ্বাস নামে আরও এক শিকারিকে ৩২ কেজি হরিণের মাংসসহ আটক করা হয়।
মোট ৪২ জন শিকারিকে আটক করা হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পলাতক রয়েছে ৮৬ জন। বনদস্যু চক্র অত্যন্ত সংগঠিত। বন বিভাগের নজরদারির ২৪টি ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যা অভিযানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে।
পরিবেশগত দিক থেকেও শরণখোলা রেঞ্জে নতুন হুমকি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে—বনের জনবসতিহীন অঞ্চলের বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে, যা জলবায়ু, প্রাণী ও মানুষের জন্য বিপজ্জনক।
পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) রেজাউল করিম চৌধুরী জানান,
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। শিকারি চক্র অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী। তারা কখনও জেলে বা পর্যটকের ছদ্মবেশে প্রবেশ করে, কখনও ট্রলার ব্যবহার করে শিকারে আসে। তবে আমরা বন, কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে অভিযানের ধারা অব্যাহত রাখছি।
অবৈধ ফাঁদ, শিকারি সরঞ্জাম এবং বন্দী প্রাণী উদ্ধারের কাজ চলমান। এছাড়া শরণখোলা রেঞ্জে জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ এবং বনদস্যুতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা প্রযুক্তি ও সম্প্রদায়ের সহযোগিতার মাধ্যমে কার্যক্রম জোরদার করছি। আমাদের লক্ষ্য—সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা বজায় রাখা, যাতে বন ও মানুষ দুটোই সুরক্ষিত থাকে।
বন বিভাগের উদ্যোগে নভেম্বর মাসে ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা AFD (Agence Francaise de Developpement) এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা IUCN যৌথভাবে, CRIS (Conservation and Restoration Initiatives in the Sundarbans Region) প্রকল্প চালু করেছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, অবৈধ শিকার রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা।
শরণখোলা রেঞ্জের তিন মাসের ঘটনা প্রমাণ করে,
নীরব বন থেকে শুরু করে মানুষের পদচারণা ও উৎসবের ভিড় পর্যন্ত, প্রকৃতি ও মানুষের সংযোগ, বনদস্যুতা ও শিকারি চক্র, পরিবেশ সংকট—সবই চলমান চ্যালেঞ্জ। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব টেকসইভাবে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এ জাতীয় আরো খবর..