মোঃ অলিউদ্দিন মিলন
বিশেষ প্রতিনিধি
নির্বাচন কড়া নাড়ছে দুয়ারে। পাড়া-মহল্লায় চায়ের কাপে ঝড় উঠছে, দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে রঙিন পোস্টার। রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠে এখন একটাই সুর— "সবার আগে বাংলাদেশ", "জনগণই সকল শক্তির উৎস", "আসুন একসাথে দেশ গড়ি"। কিন্তু এই চটকদার স্লোগান আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি সাধারণ মানুষের মনে আশার চেয়ে সংশয়ই বেশি জাগাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জনগণের প্রশ্ন—এসব কি তাদের মনের কথা, নাকি কেবলই ভোটের অঙ্ক?
প্রতিশ্রুতির পাহাড় ও বাস্তবের ধূসর চিত্র
বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি দলই ক্ষমতা লাভের আগে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনের অঙ্গীকার করে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার সাজানো হয়। কিন্তু রেকর্ড বলছে, নির্বাচনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই ইশতেহার হিমাগারে চলে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলো ক্ষমতাকে জনগণের সেবার বদলে 'ব্যক্তিগত বা দলীয় সম্পদের উৎস' হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। নির্বাচনের আগে যারা "সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর" মন্ত্র জপেন, গদিতে বসার পর তাদের অনেকের কাছেই সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হয়ে যায়। উন্নয়নের বদলে প্রাধান্য পায় টেন্ডারবাজি, আত্মীয়করণ এবং লুটপাটের 'পেট নীতি'।
এবারও কি পুরনো পথেই হাঁটবে দলগুলো?
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই প্রেক্ষাপটে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখন আকাশচুম্বী। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ও কাজ করছে। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সবার মনে একই শঙ্কা: "ভোটের পর তারা কি আমাদের চিনবে?"
টি আই বি-র (TIB) বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকে। সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও দলীয়করণ আর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার যেন অবধারিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ জনগণের ভাবনা—এবারও কি জয়ী হয়ে তারা আগের মতোই চলবেন? জনগণের স্বার্থ কি আবারো কোণঠাসা হবে গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে 'জবাবদিহিতার অভাব' এই সমস্যার মূল কারণ। নির্বাচনের আগে ইশতেহার বাস্তবায়ন না করলে কোনো আইনি শাস্তির বিধান নেই। ফলে দলগুলো দায়মুক্তভাবে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। তারা মনে করেন, জনগণের উচিত এবার কেবল স্লোগান দেখে নয়, বরং প্রার্থীদের পূর্বের রেকর্ড এবং দলের স্বচ্ছতা বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
"মুখে সবার আগে
বাংলাদেশ বললেও, কাজে সবার আগে নিজেদের আখের গোছানোই যেন কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে"এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন রাজধানীর এক প্রবীণ নাগরিক। সাধারণ মানুষ এবার আর কেবল মুখের কথায় ভুলতে রাজি নয়। তারা চায় এমন এক নেতৃত্ব, যারা নির্বাচনের পর ড্রয়িংরুমে বসে নয়, বরং রাজপথে দাঁড়িয়ে জনগণের সমস্যার সমাধান করবে।
বাংলাদেশ কি এবার এই 'ইশতেহারের ট্র্যাপ' থেকে মুক্তি পাবে? নাকি আবারো 'পেট নীতি'র জয় হবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আসন্ন ব্যালট পেপারে আর বিজয়ী দলের পরবর্তী পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডে।
এ জাতীয় আরো খবর..