বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এরপর দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় তিনি দেশে ফেরেননি। তার দেশে না ফেরার কারণগুলো মূলত আইনি সাজা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বা কূটনৈতিক প্রটোকলের সমষ্টি।
১. অতীত আইনি প্রতিবন্ধকতা (কেন এতদিন ফিরতে পারেননি?)
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। এই সাজাগুলোর কারণেই তিনি দেশে ফিরলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার ও কারাবাস নিশ্চিত ছিল।
প্রধান যে মামলাগুলো তার ফেরার পথে বাধা ছিল:
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা: এই মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এটিই ছিল তার দেশে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় আইনি বাধা।
মুদ্রা পাচার (মানি লন্ডারিং) মামলা: সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের অভিযোগে একটি মামলায় হাইকোর্ট তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা: এই মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এই মামলায় তাকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পলাতক ঘোষণা: আদালতের পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও উপস্থিত না হওয়ায় তাকে আইনগতভাবে 'পলাতক' ঘোষণা করা হয়েছিল এবং তার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
২. বর্তমান আইনি পরিস্থিতি (২০২৪-২০২৫ পরবর্তী পরিবর্তন)
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমানের আইনি অবস্থানে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী:
মামলা থেকে খালাস: রাষ্ট্রপতির আদেশে এবং উচ্চ আদালতের রায়ে তার বিরুদ্ধে থাকা প্রধান মামলাগুলো (যেমন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও অন্যান্য সাজা) থেকে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় খালাস (Acquittal) পেয়েছেন বা তার সাজা মওকুফ/বাতিল করা হয়েছে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার: তার বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ গ্রেফতারি পরোয়ানা বর্তমানে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, তাকে গ্রেফতার করার মতো পুরনো 'সাজা' বা 'দণ্ড' এখন আর কার্যত নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও জানিয়েছে, তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আইনি বাধা নেই।
৩. তবুও কেন তিনি ফিরছেন না? (বর্তমান জটিলতা)
আইনি বাধা অপসারিত হওয়ার পরেও তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরছেন না বা ফিরতে পারছেন না। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ ধারণা করা হয়:
ক. পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা (Travel Documents)
লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে (Political Asylum) থাকার কারণে তিনি অনেক আগেই তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে জমা (Surrender) দিয়েছিলেন।
তার কাছে বর্তমানে মেয়াদসহ বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই।
দেশে ফিরতে হলে তাকে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে 'ট্রাভেল পাস' (Travel Pass) বা নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। সরকার জানিয়েছে, তিনি আবেদন করলেই দ্রুত ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে। এটি একটি প্রক্রিয়াগত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হতে পারে।
খ. কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণ ("একক নিয়ন্ত্রণে নেই")
খুব সম্প্রতি (নভেম্বর ২০২৫) তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, "দেশে ফেরার বিষয়টি আমার একক নিয়ন্ত্রণে নেই।"
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের (যেমন ভারত বা পশ্চিমা বিশ্ব) 'রিজারভেশন' বা আপত্তিকে ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন।
এছাড়া, নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি হয়তো কৌশলগত কারণে অপেক্ষা করছেন। তিনি এমন সময়ে ফিরতে চান যখন তার উপস্থিতি দলের নির্বাচনী প্রচারণায় সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলবে।
গ. নিরাপত্তা শঙ্কা
যদিও তিনি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন, তবুও দেশের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, অতীতে তারেক রহমান ফিরতে পারেননি কারণ ফিরলেই তাকে ২১ আগস্ট ও দুর্নীতির মামলায় যাবজ্জীবন সাজা খাটতে হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই আইনি বাধা নেই। এখন তার না ফেরার কারণ মূলত পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রটোকল এবং কৌশলগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তিনি সম্ভবত নির্বাচনের তফসিল বা একটি সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় আছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..