খন্দকার মোহাম্মাদ আলী,
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
বেলকুচি উপজেলায় নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, সরকারি জায়গা দখল, যানজট নিরসন ও মাদক বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে ইউএনও অফিসে কোর্ট ফি দিয়ে দরখাস্ত দিলে মিলছে না কোনো সাড়া। ভুক্তভোগীরা নিরুপায় হয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের শরণাপন্ন হলেও সেখানেও রয়েছে স্বজনপ্রীতি আর দলীয় ব্যক্তিদের অনৈতিক সিন্ডিকেট। অর্থ ছাড়া মেলে না সামাজিক কোনো সমস্যার সমাধান।
বেলকুচি উপজেলার অধিকাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে তাঁত শিল্প। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এ শিল্পে শব্দ দূষণ ও বায়ু দূষণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একের পর এক গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও তা নিয়ে নেই কোনো সমাধানের পথ। বরং প্রতিনিয়ত শিল্প দূষণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ শিল্প থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে নেননি কোনো সমাধানের উদ্যোগ। একইভাবে চলছে এ শিল্পে অনিয়ম ও দূষণকর পরিবেশের কার্যক্রম।
অনুরূপভাবে বেলকুচি ভূমি অফিসেও রয়েছে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। সেখানে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র ভূমি মালিকেরা। দৃশ্যমান দুর্নীতি-অনিয়মের সংবাদ বারবার প্রকাশ হলেও নিরবেই থেকে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে এলাকাবাসী জানান, বেলকুচি উপজেলায় নির্বাহী অফিসারের নিকট কোর্ট ফি দিয়ে অভিযোগ দাখিল করলেও সে অভিযোগ হয়তো পড়েন না বা খুলেও দেখেন না। অযথা সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানি করে ফাইলবন্দি করছেন অভিযোগগুলো। দলীয় ব্যক্তিদের এবং গুরুত্বপূর্ণ দিবসের সভা-সেমিনার করতেই যায় সময়। কৃষক, শ্রমিক আর খেটে খাওয়া সহজ-সরল মানুষ সরকারি কোনো সেবা পাচ্ছে না। অসহায় নির্দলীয় ব্যক্তিরা ক্ষমতার হস্তক্ষেপে অফিসে ফাইল পড়ে থাকতে দেখেন শুধু। এছাড়া এ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সচেতন ব্যক্তিরা টেলিফোনে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য জানালেও তার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। একমাত্র দলীয় ব্যক্তিদের ইশারা ছাড়া কোনো কিছুই করছেন না ইউএনও আফরিন জাহান।
কৌশলে স্থানীয় গণমাধ্যমেও করেছেন ত্রিমুখী বিভক্তি, যার কারণে অহরহ ঘটছে সাংবাদিকদের মাঝে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা, মামলা ও হামলা। পক্ষপাতমূলক আচরণে এই এলাকায় আরও বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদকদের কাছে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেলকুচি উপজেলা প্রশাসনের অলস দায়িত্ব পালনের ফলে এলাকায় বেড়েছে চুরি, মাদক বিক্রয়, ডাকাতি, হত্যা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে সহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তাণ্ডব। যার প্রধান কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনের অলস দায়িত্ব পালন, গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক আচরণে সাংবাদিকদের বিভক্ত করে নিষ্ক্রিয় ও স্থবির করে ফেলা এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের মাঝে অপরাধমূলক আতঙ্ক সৃষ্টি করা। মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলায় ফাঁসানোসহ নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আইনের শাসনে নিয়ন্ত্রণ না করার জন্যই ঘটছে এ রকম অবস্থা।
এছাড়া এলাকার তাঁত শিল্পের মাঝে নানা অপরাধ দৃশ্যমান হলেও প্রশাসন নিরব। কোটি কোটি টাকার অবৈধ ভারতীয় সুতার রমরমা ব্যবসা চলছে, দেখার কেউ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘুমিয়ে আছে তাঁত শিল্পের শব্দ দূষণ, পানি দূষণ ও বায়ু দূষণ বিষয়ে। তাদের নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। অবৈধ পন্থায় ব্যাংক ঋণ নিয়ে কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তাঁত মালিকেরা। এ শিল্প দেখিয়ে এর অর্থ অন্য ব্যবসায় গোপন বিনিয়োগ করছে অসাধু কিছু তাঁত মালিক। তাঁত বোর্ডের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে অসৎ উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা জানান, পানি দূষণের ফলে কিডনি, চর্ম ও হার্টের সমস্যায় জীবন বিপন্ন হচ্ছে। শিশুরা শব্দ দূষণের ফলে মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগছে, স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে, পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে উঠছে।
ডাইং হাউসের মালিকেরা সিন্ডিকেট করে মোটা অঙ্কের টাকার মাধ্যমে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চালাচ্ছে এসব অনৈতিক কার্যক্রম। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বারবার সংবাদ প্রকাশ হলেও মিলছে না কোনো সমাধান। উল্টো প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে নানারূপ হুমকি প্রদর্শন করে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদকারীদের। এ তাঁত শিল্পের সূতা রংয়ের কেমিক্যাল যুক্ত দূষিত পানি ভূগর্ভস্থ করার ফলে টিউবওয়েলের পানি সেবনে অসুস্থ হয়ে পরছে এলাকার সর্বস্তরের জনসাধারণ এর নেই কোন প্রতিকার। এসকল অনৈতিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে শুধু প্রশাসনই নয়, এলাকার রাজনৈতিক ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের পকেট ভর্তি করতেও তাঁত মালিকদের রয়েছে সিদ্ধহস্ত।
এছাড়া কৃষকদের সেচ প্রকল্পেও রয়েছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও সেচ মালিকরা পান না অভিযোগের কাঙ্ক্ষিত সমাধান। যানজট নিরসনেও নেই কোনো পদক্ষেপ।
এলাকাবাসীর দাবি, বেলকুচি প্রশাসন জনস্বার্থে প্রতিটি অভিযোগ আমলে নিয়ে দ্রুত সমাধান করবে, জনমনে শৃঙ্খলা ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং এলাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করে সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা ও আইনি সেবা নিশ্চিত করবে।
এ ব্যাপারে বেলকুচি থানার ওসি তদন্ত (ইনচার্জ) অফিসার মো: জহুরুল হক জানান, বেলকুচি উপজেলায় যেকোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে আমরা বদ্ধপরিকর। জনস্বার্থে প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এতে আমাদের কোনো অলসতা নেই।
এ বিষয়ে বেলকুচি উপজেলার নির্বাহী অফিসার আফরিন জাহানকে বারবার যোগাযোগ করেও তাকে না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।