বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নবযুগ সূচিত হতে যাচ্ছে। যাত্রীসেবার দ্রুততা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিশ্বমানের নগর গণপরিবহন গড়ে তোলার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত রুটে চালু করা হচ্ছে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন (Electric Multiple Unit - EMU)। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওভারহেড ট্র্যাকশন ভিত্তিক বৈদ্যুতিক রেল যুগে পদার্পণ করছে, যা রাজধানী ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলভিত্তিক উপশ্রমিক ও অর্থনৈতিক হাবগুলোর মধ্যে রেপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
ঐতিহ্যবাহী ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে রেলপথের ওপর বিদ্যুতের লাইন (Overhead Catenary Line) তৈরি করা হবে। জাতীয় পাওয়ার গ্রিড থেকে সাব-স্টেশনের মাধ্যমে ট্রেনগুলো সরাসরি বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে চলবে।
বৈদ্যুতিক ইএমইউ (EMU) ট্রেনগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতি বাড়াতে এবং কম দূরত্বে থামতে সক্ষম। স্টেশন ছাড়ার পরপরই এগুলো পূর্ণ গতি অর্জন করায় সামগ্রিক যাতায়াতের সময় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বিদ্যমান রেললাইনকে ওভারহেড ইলেকট্রিক ট্র্যাকিংয়ে রূপান্তরিত করার জন্য মেগা অবকাঠামোগত সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন (EMU) চালুর ফলে প্রচলিত ডিজেল ট্রেনের জ্বালানি, গতি ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা দূর হবে; কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত ডিজেল ট্রেনগুলো যেখানে উচ্চমূল্যের আমদানি করা ডিজেলে পরিচালিত হয় এবং ক্ষতিকর ধোঁয়া, কার্বন ও তীব্র শব্দ তৈরি করে ধীরগতিতে পূর্ণ গতি অর্জন করে, সেখানে নতুন ইলেকট্রিক ট্রেনগুলো জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে প্রাপ্ত সাশ্রয়ী শক্তিতে পরিচালিত হয়ে জিরো-কার্বন নিঃসরক ও ১০০% পরিবেশবান্ধব হিসেবে কাজ করবে।
এর তাত্ক্ষণিক ত্বরণ ক্ষমতার কারণে সময় সাশ্রয় হবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, যা প্রতি লাইনে সীমিত ট্রিপের পরিবর্তে একই ট্র্যাকে ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি দ্বিগুণ করা সম্ভব করে তুলবে এবং অত্যন্ত কম পরিচালন ও মেরামত ব্যয়ে যাত্রীদের দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করবে।
প্রতিদিন গাজীপুর, জয়দেবপুর, টঙ্গী এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার প্রয়োজনে ঢাকায় যাতায়াত করেন। মহাসড়কের যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় এবং অতিরিক্ত গণপরিবহন ব্যয়ের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেবে এই বৈদ্যুতিক ট্রেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পটি কেবল দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করবে না, বরং রাজধানীর চারপাশে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি পোশাক শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোর সরবরাহ চেইনকে (Supply Chain) নতুন গতি এনে দেবে।