নিজস্ব প্রতিবেদক:
রানওয়ে ও টার্মিনালের পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যায়নি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। অবশেষে এই বিমানবন্দরকে একটি লাভজনক আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করতে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় প্রি-প্রজেক্ট প্রপোজাল (পিডিপিপি) তৈরির পাশাপাশি ১৮ মাস মেয়াদি একটি ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি বা ৩০০ মিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবিত খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রথম ধাপে মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি ন্যূনতম আঞ্চলিক হাব গড়ে তোলার টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ওয়াইড-বডি বা বড় আকৃতির উড়োজাহাজ পরিচালনা, ট্রান্সফার যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত এয়ার কার্গো হ্যান্ডলিং বা পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা অর্জন করা।
তহবিলের উৎস: এই ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ বা অনুদান হিসেবে পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে সরকার এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
সক্ষমতা বৃদ্ধি: কর্তৃপক্ষের জোরালো প্রত্যাশা, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা বর্তমানের ৫ মিলিয়ন থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১০ মিলিয়নে উন্নীত হবে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন এই প্রকল্প নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করার পাশাপাশি কিছু বাস্তবিক চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন। তার মতে, এখান থেকে নিয়মিত কার্গো ও যাত্রী পরিবহন করার জন্য যে বিশাল পরিমাণ ল্যান্ডস্পেস বা জায়গার প্রয়োজন, বর্তমান মুহূর্তে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হাতে সেই পরিমাণ পর্যাপ্ত জায়গা খালি নেই।
এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে বিকল্প কৌশল হিসেবে 'টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং'-এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমকারী অনেক বিমান এক দেশ থেকে উড়ে এসে মাঝপথে কলকাতায় অবতরণ করে থাকে। সেখানে তারা ফুয়েল রিফিল করে এবং ক্যাটারিং সার্ভিসসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা নেয়। যাত্রী পরিবহনের জটিলতা এড়িয়ে এই ধরনের টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং বা প্রযুক্তিগত অবতরণের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তা আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ ও লাভজনক হবে।
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মো. আসিফ চৌধুরীর কণ্ঠেও। তিনি জানান, জাপান ও কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার (ফার ইস্ট) দেশগুলো থেকে ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্বের দিকে যাতায়াতকারী বিমানগুলো যদি চট্টগ্রামকে একটি প্রধান ফুয়েল ও টেকনিক্যাল হাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তবে তা থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হবে পুরো দেশ। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চমৎকার ভৌগলিক অবস্থানকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরটিকে একটি আঞ্চলিক টেকনিক্যাল হাবে পরিণত করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ের পথ আরও সুগম হবে।
সরকারি এই পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানালেও, বিমানবন্দরটিকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে এখনো কিছু সংশয় ও শঙ্কা রয়ে গেছে। পর্যাপ্ত কার্গো বা পণ্যের জোগান না থাকায় অতীতে অনেক এয়ারলাইন্সই কার্গো সেবা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মাহবুব রানা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে আমরা যদি চাইও তবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপের বাজারে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি করতে পারি না। কারণ, চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি এ ধরনের পণ্য নিয়মিত ও নির্বিঘ্নে বিদেশে পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত এয়ার কার্গো পরিবহন সুবিধা বা কোল্ড চেইন লজিস্টিকস নেই।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে হলে কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কার্গো ও যাত্রীদের একটি স্থায়ী ও পর্যাপ্ত চাহিদা (Demand) তৈরি করতে হবে। আর এই চাহিদা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো এখানে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে উৎসাহিত হবে।