আন্তর্জাতিক
রাশিয়ার লাগাতার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করতে মোট ৫০০টি অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইউক্রেনের কাছে এই সম্ভাব্য সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান দ্বিতীয় মেয়াদে কিয়েভকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের দিক থেকে এটিকে অন্যতম বৃহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
অনুমোদিত এই ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২১০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এই সামরিক ক্রয়ে মার্কিন সরকারের নিজস্ব কোনো তহবিল বা অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ইউক্রেন সাপোর্ট লোন' এবং কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ের যৌথ অনুদানের মাধ্যমে এই ক্রয়ের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা হবে।
প্রাথমিক অনুমোদন মিললেও এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো খুব দ্রুত ইউক্রেনের হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম। সাধারণত এ ধরণের অস্ত্র বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। মার্কিন এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল দুজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানিয়েছেন, অনুমোদিত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর এখনো উৎপাদনই শুরু হয়নি। ফলে ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক ছাড়া এগুলো ইউক্রেনে সরবরাহ হওয়ার কোনো জোরালো সম্ভাবনা নেই।
এদিকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা আরও এগিয়ে আনার জন্য পেন্টাগনের প্রতি জোর অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক মজুত থেকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে ইউক্রেনকে সরবরাহ করে পরবর্তীতে নতুন উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করার একটি প্রস্তাবও বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র আগ্রাসন প্রতিহত করতে ইউক্রেন দীর্ঘসময় ধরে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর বা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী অস্ত্র চেয়ে আসছিল। বিশেষ করে আকস্মিক ও দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ রুখে দিতে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বক্তব্যে জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অনুমোদনের জন্য তারা প্রায় এক মাস ধরে অপেক্ষা করছিলেন, কারণ দেশটির নিজস্ব মজুত ইতোমধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে ফুরিয়ে আসছিল।
গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন এই ঘোষণাকে তিনি সাধুবাদ জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, ইউক্রেনের জন্য এই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক ‘এই মুহূর্তে’ অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আসন্ন শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই রাশিয়া ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডের অতি সংবেদনশীল অংশগুলোতে ৩০টিরও বেশি রুশ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কিয়েভের এই ইন্টারসেপ্টরগুলোর তীব্র ও আশু প্রয়োজন থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ব্যবহার এবং বৈশ্বিক চাহিদার কারণে বিশ্বজুড়ে এই অস্ত্রের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দিষ্ট উৎপাদনসূচি কেমন হবে তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান অর্ডারের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের কোনো স্টক থেকে নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন করে উৎপাদনের জন্য দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় ইউক্রেনীয়দের জন্য খুব দ্রুত এই অস্ত্র হাতে পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
তাছাড়া প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘমেয়াদী। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিশ্বে প্রতি বছর মাত্র ৬০০টি এই ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদিত হয়ে থাকে।