খন্দকার মোহাম্মদ আলী, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
সম্প্রতি দেশের চলমান রাজনীতিতে প্রতিহিংসার উত্তাপ ক্রমেই দাবানলে পরিণত হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে—একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার আশায়। বটবৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী রাজনীতির প্রতিষ্ঠানগুলো আজ শহীদ মিনারের দেয়ালের মতো স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে স্থবিরভাবে, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে।
কিছু বলার নেই, বোঝার নেই, মন্তব্য করারও সাহস নেই—কোনো পক্ষের হয়ে সত্যতা যাচাই করে ভালো-মন্দের তফাৎ উপস্থাপন করারও দুঃসাহস আজ বিলীন। তবে আছে দুটি আখির দৃষ্টিতে দৃশ্যমান এক অনুভব—উষ্ণ অশ্রুর গড়া পরিশুদ্ধ জল। এই জলে ভেসে ওঠে মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার করুণ পরিণতি, যা তাদের নীরব কান্নায় জমাট বাঁধা কালো মেঘের মতো অনাহারিদের আত্মচিৎকার বহন করে চলে অদৃশ্য শক্তিতে।
উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসন্ধানে সেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে জানাযায়,
দেশের মফস্বল এলাকাতেই নয়, শহরেও নীরব কান্নার অংশীদার লাখ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবার। কর্মহীন হয়ে ‘বেকার’ শব্দের ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে দিকবিদিক ছুটে চলেছে তারা। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে অনেকেই ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে স্ত্রী-সন্তান ফেলে পাড়ি দিচ্ছে প্রবাসে। সেখানেও নেই প্রশান্তি—আছে শুধু দুমুঠো অন্ন আর পরিশ্রমের বিনিময়ে পাওয়া সামান্য কিছু অর্থ। তা দিয়েই দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণ চলে; কিন্তু প্রবাসী জীবনে থাকে না কোনো আত্মতৃপ্তি। রোবটের মতো যান্ত্রিক জীবনে শুধু কাজ আর কাজ।
দেশে রেমিট্যান্স আসায় সরকারি সহযোগিতায় আরও বেশি মানুষকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। অথচ দেশের জন্মভূমিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে থাকার নিশ্চয়তা কোনো রাজনীতিবিদ দিচ্ছেন না। অনাহারীদের ক্ষুধাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির নেতারা নিজেদের ক্ষুধা নিবারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন—মানুষকে কর্মহীন করে কৌশলে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সরকার আসে, সরকার যায়—নীতিনৈতিকতার চাকা ঘুরে চলে একই বৃত্তে।
সংস্কার কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন আসার কথা বলা হলেও, নিরপেক্ষ ও দলহীন মানুষগুলো পড়ে থাকে অবহেলিত। রাজনীতিতে দেশের মানুষের কল্যাণের কথা বলা হলেও, নিরপেক্ষ মানুষের প্রতি কারোরই দায়বদ্ধতা নেই। সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের মঞ্চে উচ্চারিত বক্তব্য যেন জনগণের সঙ্গে এক নতুন মিথ্যাচারের নাটক। এতে নেই কোনো সভ্য সমাজের বিবেকবান কণ্ঠস্বর—আছে শুধু প্রতিহিংসা, ধ্বংস আর বিষাক্ত কথার বাষ্প।
আজ রাজনীতির মাঠে অন্যায়, অপরাধ, হিংসা আর ধ্বংসের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত। বুদ্ধিজীবীরা হতবাক, কর্মজীবীরা নীরব, বেকার মানুষের হাহাকার সর্বত্র। রাজনীতিকেরা চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে ‘কিছু পাওয়ার’ আশায়। যেন সবাই এক অচেনা জাহাজের যাত্রী—প্রকম্পিত সাগর, উত্তাল তরঙ্গ, কালো মেঘ, শ্বাসরুদ্ধ বাতাস, চারদিকে আমাবস্যার অন্ধকার।
এই জাহাজের নাবিকেরা কেউ ক্লান্ত, কেউ ঘুমন্ত, কেউবা অজ্ঞতার চাদরে মোড়া। এ যেন মহাপ্রলয়ের মুখোমুখি মৃত্যুর আলিঙ্গন—স্বচক্ষে দেখা যায় যাত্রী নামের মানবকঙ্কালদের গন্তব্যহীন অপেক্ষা।
যে পথের যাত্রী হয়ে সভ্যতার গন্তব্যের খোঁজে এগিয়ে চলেছে মানুষ, সেখানে অন্যায়-অপরাধ আর হিংসার ধ্বংসযজ্ঞে বিবেক হারানো মানুষদের ভিড়। তবুও আশা থাকে—একদিন সূর্যের আলোর মতোই সর্বত্র বিরাজ করবে বিবেকবান, সৎ ও মানবিক মানুষদের বিকশিত রূপ। এদের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠবে এক সূচিশুভ্র, সুন্দরতম সমাজব্যবস্থা।