মোঃঅলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি :
[শীর্ষক: মৌলিক অধিকার যখন বাণিজ্যিক পণ্য]
বাংলাদেশের সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হলেও, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ পুঁজি ও স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে বন্দী। মানসম্মত শিক্ষা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পরিবর্তে, এটি একটি ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে শিক্ষা খাতে অর্থ ছাড়া অস্তিত্বহীনতা এবং দুর্নীতির রীতিনীতি প্রমাণ করে, একটি উন্নত শিক্ষিত জাতি গঠনের পথে দুর্নীতিই এখন প্রধান অন্তরায়।
১. ভর্তি ও নিয়োগে সিন্ডিকেটের আগ্রাসন: টাকার বিনিময়ে প্রবেশাধিকার
শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে সুযোগ তৈরি করা একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই অনিয়মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় শিক্ষা অফিস পর্যন্ত বিস্তৃত।
ভর্তিবাণিজ্য: ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভর্তির ক্ষেত্রে ঘুষ ও অননুমোদিত অর্থ লেনদেনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বিশেষ করে মানসম্মত বা নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের একটি বড় অংশকে (একটি জরিপ অনুযায়ী ৪১%) ঘুষ দিতে হয়। এটি ‘ভর্তিবাণিজ্য’ নামে পরিচিত, যা সমাজের বিত্তবানদের জন্য শিক্ষার পথ সুগম করলেও দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করে।
শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা: শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির (Nepotism) শিকার। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক (কোনো কোনো হিসাব মতে ৫২%) কমিটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়। ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হওয়ায় ক্লাসরুমে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা শিক্ষার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জাল সার্টিফিকেট: শিক্ষাব্যবস্থায় সিন্ডিকেটের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাবগুলোর মধ্যে একটি হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে জাল সনদপত্র প্রদানের নজিরও রয়েছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
২. শিক্ষার মান ও কর্মসংকট: জ্ঞান অর্জনের ঘাটতি
পিতা-মাতার রক্ত পানি করা অর্থে সন্তানরা উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও, মানসম্মত জ্ঞানার্জনে ঘাটতি থাকায় কর্মজীবনে এসে তারা বেকারত্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর এ+ বা জিপিএ-৫ পাওয়া সত্ত্বেও, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় বা চাকরির বাজারে তাদের প্রকৃত জ্ঞানের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
শিখন ঘাটতি (Learning Poverty): বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী ১১ বছর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পরও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মাত্র ৬.৫ বছরের সমতুল্য জ্ঞান অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি প্রায় সাড়ে চার বছরের। এর মূল কারণ হলো মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি এবং ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ব্যর্থতা: দেশের ১৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও, টাইমস হায়ার এডুকেশন বা কিউএস-এর মতো বিশ্বসেরা কোনো র্যাংকিংয়েই শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অবস্থান নেই। এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে।
স্নাতক বেকারের হার: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট বেকারের একটি বড় অংশ (প্রায় ১৩.৫ শতাংশ) স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এর থেকেই বোঝা যায়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা (Soft Skills, Analytical Ability) তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৩. প্রশাসনিক দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপব্যবহার
সরকারের বাজেটের একটি বিশাল অংশ শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু প্রশাসনিক স্তরে সেই অর্থের বড় একটি অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে।
টেক্সটবুক চুরি ও ‘ভূতুড়ে স্কুল’: বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য পাঠ্যপুস্তক বিতরণেও দুর্নীতি লক্ষ্য করা যায়। অ্যান্টি-করাপশন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতরণকৃত মোট বইয়ের ১০-১৫% পর্যন্ত প্রতি বছর গায়েব হয়ে যায়। এই অর্থ আত্মসাতের জন্য 'ভূতুড়ে স্কুল' (Ghost Schools) নামে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামেও বই বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থও সমন্বয়হীনতা এবং দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। দেখা গেছে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্পে প্রায় ২৭% পর্যন্ত ওভারল্যাপ বা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ের চাঁদাবাজি: জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয় কমিটি এবং স্থানীয় অপরাধ চক্রের যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের (যেমন নাম সংশোধন, টাইম স্কেল অনুমোদন) জন্য শিক্ষকদের কাছ থেকেও নিয়মিত ঘুষ আদায়ের অসংখ্য নজির রয়েছে।
উপসংহার:
শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা কেবল দুর্নীতির প্রশ্ন নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের পথে একটি গুরুতর বাধা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং গুণগত মানের অবনতি—এই ত্রিমুখী সংকটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চ্যালেঞ্জের মুখে। অবিলম্বে শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা, পাঠ্যক্রমকে দক্ষতাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে, উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
এ জাতীয় আরো খবর..