‘১০ বছরে ১৫% মুনাফা’র প্রলোভন দেখিয়ে সঞ্চয় হরণ; রসিদ-ফাঁদে ফেলে দায় এড়ানোর চেষ্টা দুই অভিযুক্তের
লুৎফা সরকার নিশু, ময়মনসিংহ :
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের চকরামপুর মেহের সরকার বাড়ি এলাকায় 'ইসলামি জীবন বীমা' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বহু বছর ধরে ৩০০ এর অধিক দরিদ্র মানুষের সঞ্চয়ের কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লাভের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব হওয়া ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরতের আশায় অপেক্ষা করছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রায় দুই দশক আগে স্থানীয় আহমেদ ও কাদির নামে দুজন ব্যক্তি নিজেদেরকে 'ইসলামি জীবন বীমা' সংস্থার এজেন্ট পরিচয় দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা সংগ্রহ শুরু করেন। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ প্রতি মাসে জমা নেওয়া হতো। গ্রাহকদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, ১০ বছর পূর্ণ হলে জমাকৃত মূল টাকার সাথে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ হারে মুনাফা ফেরত দেওয়া হবে।
দীর্ঘ ১৭ বছরেও ফেরেনি এক টাকাও
প্রতিশ্রুত ১০ বছরের মেয়াদ অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরও যখন কোনো গ্রাহক টাকা ফেরত পাননি, তখন তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ১৭ বছর পার হলেও ৩০০ গ্রাহকের কেউই এক টাকাও ফেরত পাননি। মুনাফা তো দূরের কথা, মূল টাকাও ফেরত না দিয়ে অভিযুক্ত আহমেদ ও কাদির এখন বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তাদের সঞ্চিত অর্থ এই দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়েছে।
মসজিদকর্মী থেকে কোটি টাকার মালিক: সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম আহমেদ পূর্বে একটি মসজিদে সামান্য ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা বেতনে চাকরি করতেন। কিন্তু বর্তমানে তার জীবনযাত্রায় এসেছে আকাশছোঁয়া পরিবর্তন। এলাকাবাসীর দাবি, ত্রিশাল বাজার এলাকায় তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে জমি ক্রয় করেছেন এবং বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
যখন সাংবাদিকেরা আহমেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তার উপার্জনের উৎস সম্পর্কে জানতে চান, তখন তিনি কোনো সঠিক বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। সম্পদের উৎস জানতে চাইলে আহমেদ দাবি করেন, "জমিতে কৃষিকাজ করে" তিনি এই সম্পদ করেছেন। তবে তার এই দাবির স্বপক্ষে তিনি কোনো প্রকার প্রমাণ বা দালিলিক কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি। এই বিপুল সম্পত্তির উৎস নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দোষারোপ ও রসিদ হারানোর ফাঁদ
টাকা ফেরতের বিষয়ে চাপ বাড়লে আহমেদ সমস্ত দায়ভার অন্য অভিযুক্ত কাদির নামে এক ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেন। আহমেদ দাবি করেন, তিনি গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কাদিরের কাছে জমা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত কাদির জানান, "যাদের কাছে জমা দেওয়ার রসিদ বা বই আছে, শুধু তারাই টাকা ফেরত পাবেন, অন্য কেউ নয়।"
দীর্ঘ ১৭ বছরের কালপরিক্রমায় অনেক গ্রাহক বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন, আবার অনেকেই তাদের পুরোনো রসিদ বা পাসবুক হারিয়ে ফেলেছেন। কাদিরের এই শর্তের ফলে রসিদবিহীন বা মৃত গ্রাহকের পরিবারবর্গ সম্পূর্ণভাবে তাদের প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই শর্ত প্রতারণা জালে ফেঁসে যাওয়া মানুষদের আরও বিপাকে ফেলার একটি কৌশল।
আইনগত ব্যবস্থা ও তদন্তের দাবি
প্রতারণার শিকার হওয়া ৩০০-এর বেশি মানুষ এখন দ্রুত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মূল দাবিগুলো নিম্নরূপ:
দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা: ভুক্তভোগীদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পেতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ: আহমেদ ও কাদিরের অস্বাভাবিক সম্পদের উৎস এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বচ্ছ তদন্ত ও শাস্তি: 'ইসলামি জীবন বীমা'র নামে পরিচালিত এই প্রতারণার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
হারানো রসিদের বিকল্প ব্যবস্থা: যে সকল গ্রাহক রসিদ হারিয়েছেন বা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প প্রমাণ (যেমন: স্থানীয় সাক্ষী বা ব্যাংকের লেনদেনের নথি) যাচাই করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ সরকারি নিবন্ধন বা তদারকি ছাড়াই কীভাবে সরলমনা দরিদ্র মানুষেরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ না নিলে এই ধরনের অনিবন্ধিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা।
এ জাতীয় আরো খবর..