এম মোহাম্মদ ওমর, শরণখোলা বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
পূর্ব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে যখন পৃথিবী আলোকিত হতে শুরু করত, তখনই মুখরিত হয়ে উঠত গ্রামবাংলা। পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ত ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ। কৃষকের ঘুম ভাঙানো সেই শব্দ আজ শুধু স্মৃতির পাতায়। বিয়ে–শাদি, নবান্ন কিংবা শীতের পিঠা—যে উৎসবেই ঢেঁকি ছাঁটা চালের প্রয়োজন ছিল, ঢেঁকির তালে কান পাতলেই মিলত সঙ্গীতময় পরিবেশ। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই দৃশ্যগুলো মিলিয়ে গেছে গ্রাম্য জীবনের আঙিনা থেকে।
এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি গৃহস্থবাড়িতে ঢেঁকি ছিল অপরিহার্য। বাড়িতে ঢেঁকির সংখ্যা দিয়েই বোঝা যেত কে কত বড় গৃহস্থ। বউ-ঝিরা ভোরে উঠে ঢেঁকির তালে গাইত বাপ-দাদার আমলের গীত। ধান ভানার ফাঁকে চুড়ি-নূপুরের ঝনঝন শব্দে তৈরি হতো এক অনন্য সুরেলা পরিবেশ। নবান্নের মৌসুমে হেমন্তের হিমেল ভোরে ঢেঁকির শব্দে মুখর থাকত গৃহস্থের আঙিনা।
ঢেঁকি ছিল শুধু গৃহস্থালী উপকরণ নয়—এ ছিল একটি শিল্প। ঢেঁকিতে চাল ভানানোর কাজে যুক্ত লাখো পরিবার একসময় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ছিল। তাদের উৎপাদিত চাল গ্রামীণ বাজারে ব্যাপক চাহিদা পেত। ঢেঁকি তৈরির জন্য বাছাই করা হতো কাঠ; বাবলা কিংবা কড়ই গাছ দিয়ে দক্ষ মিস্ত্রিরা তৈরি করতেন নকশাদার ঢেঁকি। গৃহস্থরাও তাদের পছন্দের ঢেঁকি পেলে পুরস্কার দিতেন উদার মনেই।
কিন্তু পঞ্চাশের দশকের পর থেকে দেশে চালকলের প্রচলন দ্রুত বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে গ্রামীণ জনপদেও ছড়িয়ে পড়ে যান্ত্রিক ধানভাঙা মেশিন। যন্ত্রের গতির কাছে ঢেঁকির সুরেলা ছন্দ হারিয়ে যায়। ঢেঁকি শিল্পীরা কেউ চলে যান দিনমজুরিতে, কেউবা ইটভাটা, সেলাই কিংবা দর্জির পেশায়। বাড়ির আঙিনায় একসময় যেসব ঢেঁকি ছিল গর্বের প্রতীক, সেগুলো এখন পড়ে আছে গোয়ালঘরে বা পরিত্যক্ত কোণে।
তবুও কিছু উৎসব-পার্বণে, বিশেষ করে শীতের পিঠা তৈরিতে, কোথাও কোথাও এখনও ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ শোনা যায়। আত্মীয়স্বজন একসঙ্গে পাড় দিয়ে চালের গুঁড়ো তৈরির যে আনন্দ, তা যন্ত্রে ছাঁটা চাল কখনোই দিতে পারে না। আজকাল সুপার শপগুলোতে ‘ঢেঁকি ছাঁটা চাল’ নামে প্যাকেটজাত পণ্য বাজারে আসছে এবং বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে।
কালের স্রোতে ঢেঁকি আজ প্রায় বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্ম ঢেঁকির গল্প শুধু শুনে—নানি-দাদির স্মৃতিতে ফিরে আসে সেই হারানো দিনগুলো। এখন গ্রামে সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হলো রাইস মিলে চাল ভাঙার যান্ত্রিক গর্জন। ঢেঁকি হয়তো ভবিষ্যতে কেবল জাদুঘরের একটি নিদর্শন হয়ে টিকে থাকবে।
আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির কাছে এক সময়ের অপরিহার্য এই ধানভাঙা কাঠের উপকরণটি হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে। তবুও ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ আর তার সঙ্গে গ্রামীণ নারীর চুড়ি-নূপুরের সুরেলা ঝংকার আবহমান বাঙালির ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল।
এ জাতীয় আরো খবর..