মোঃ অলি উদ্দিন মিলন বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে দৃশ্যপট বিরাজ করছে, তাকে অনেকে ‘ক্ষমতা দখলের তামাশা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক সহাবস্থানমূলক না হয়ে 'মারমুখী আচরণ' এবং 'শূন্য-যোগফল প্রতিযোগিতা'র দিকে ঝুঁকছে। সংবিধান যেখানে স্পষ্ট করে 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ'-এর কথা ঘোষণা করে (অনুচ্ছেদ ৭), সেখানে বাস্তবে রাজনীতির মূল ফোকাস যেন জনগণের কল্যাণ বা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে, কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার শক্তি-পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
মারমুখী আচরণ ও অসহিষ্ণুতা: সংঘাতের মূল সুর
রাজনীতি এখন আর নীতি বা আদর্শের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে পারস্পরিক দোষারোপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সহিংসতার হুমকিতে। প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতা এতটাই তীব্র যে, তারা বিরোধী মতকে সহ্য করতে বা গণতান্ত্রিক পরিসর দিতে প্রায় অক্ষম। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যে ভাষা ও বক্তব্য ব্যবহৃত হচ্ছে, তা কেবল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই নিম্নগামী করছে না, বরং সমাজের অভ্যন্তরেও বিভেদ ও সংঘাতের বীজ বপন করছে।
বিশেষ করে নির্বাচন-কেন্দ্রিক সংঘাত বা সরকার পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতিতে 'শক্তি প্রয়োগ করা'-র প্রবণতা প্রকট হয়ে ওঠে। রাজপথে সংঘর্ষ, জ্বালাও-পোড়াও এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ—এই সবই রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষ, যারা এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রধান অংশীদার, তারা ভয় ও অনিশ্চয়তার শিকার হন।
ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ ও সুশাসনের সংকট
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতা দখলের সর্বাত্মক চেষ্টা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিজয়ী পক্ষ প্রায়শই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, যা একটি 'বিজয়ী সব নেবে' (Winner-Takes-All) মানসিকতার জন্ম দিয়েছে। এই প্রবণতার কারণে দেশের নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি দমন সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জবাবদিহিতার কাঠামোগত দুর্বলতার ফলে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। যখন রাজনীতিতে কেবল ক্ষমতায় বসার লড়াই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষাখাতের মতো মৌলিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়। এটিই প্রমাণ করে যে দলগুলো তাদের নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ে যতটা সচেতন, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ততটা নয়।
সংবিধান ও জনগণের সার্বভৌমত্ব
বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। এর অর্থ হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার বৈধতা এবং কার্যকারিতা জনগণের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তবে চলমান সংঘাতপূর্ণ রাজনীতিতে এই মৌলিক আদর্শ প্রায়শই বিস্মৃত হয়। যখন জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা অনুভব করে বা তাদের মতামতের কোনো প্রতিফলন দেখতে পায় না, তখন তারা রাজনীতির প্রতি আস্থা হারায় এবং প্রক্রিয়াটিকে 'তামাশা' হিসেবে দেখতে শুরু করে।
জনগণের প্রত্যাশা হলো, রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করবে, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবে এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেবে। বর্তমান রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে হলে দলগুলোকে অবশ্যই জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে এবং কেবল ক্ষমতা দখলের পরিবর্তে সুশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্থিতিশীলতার এজেন্ডাকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
এ জাতীয় আরো খবর..