-এম নজরুল ইসলাম খান
সত্যের সন্ধানে সাংবাদিক বনাম স্বচ্ছতাহীন আবেগীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর এর মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলেছে।আমাদের সামনে এখন স্পষ্ট প্রশ্ন আমরা দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা নাকি আবেগীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের দিকে যাচ্ছি?
তথ্যের প্রবাহের ঢেউ-তোলপাড় করে প্রতিদিনই এক অদ্ভুত সংগ্রামের মুখোমুখি করছে—সত্যের আলো আর আবেগের ঝড়। একদিকে দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা, যারা প্রতিটি খবরকে তথ্যের আলোয় যাচাই-বাছাই করে মানুষের সামনে তুলে ধরে। অন্যদিকে আবেগময় কনটেন্টের রঙিন জগৎ—যেখানে সত্যের চেয়ে গতি বেশি, বিশ্লেষণের চেয়ে উত্তেজনা বেশি, আর যাচাইয়ের চেয়ে ক্লিক ও ভিউই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ মূল্যের।
আজ বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
একটি ভিডিও, একটি ক্যাপশন, একটি সাউন্ড—মুহূর্তেই লাখো মানুষের মনোযোগ দখল করে নিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই আবেগের ঢেউ কি আমাদের সমাজকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি পিছিয়ে দিচ্ছে?
যারা facebook বা youtube বা ইনস্টাগ্রাম সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে ভিউ পাচ্ছেন ফলোয়ার, এনগেজমেন্ট বৃদ্ধি করছেন তাদের সবার মূল উদ্দেশ্য সত্যের সন্ধান নয়। তারা কত জন সমাজের আদর্পণ হিসেবে কাজ করছেন? তাদের অনেকেই গুজব এবং মিথ্যা প্রাপকান্ড, অপপ্রচার করছেন।সকল ইনফ্লুয়েঞ্জারা বা প্রভাবকেরা যে কাজ করছেনতাতে দিনশেষে সমাজের ক্ষতিই হচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার বা প্রভাবক আর জার্নালিস্ট বা সাংবাদিক বা সংবাদকর্মী/ সংবাদদাতা এক নয়, তাদের মধ্যে দূরত্ব-পার্থক্য বৃদ্ধিই পাচ্ছে। একটি হচ্ছে আবেগ নির্ভর আরেকটি হচ্ছে জ্ঞান ও সত্যতা নির্ভর। সাংবাদিক তথ্যের উপর ভিত্তি করেই গতিশীল হন আর আবেগের উপর ভিত্তি করেই ইনফ্লুয়েঞ্জারা গতিশীল হয়। তাই সাংবাদিকতার গতি আর ইনফ্লুয়জনদের গতির পার্থক্য হয়ে যাওয়ার কারণে সাংবাদিকরা প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন কম। নিয়ম-নীতির আবদ্ধ থাকতে হয় কিন্তু এক্ষেত্রে ফলোয়ার বৃদ্ধিকারী, এনগেজমেন্ট বৃদ্ধি কারীরা দ্রুতগতিতে নিয়ম-নীতিতে নেই।সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা পিছিয়ে পড়ছেন।কোন কোন ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরাও বাধ্য হয়ে তাদের সত্যনিষ্ঠতা, দায়বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে ইনফ্লুয়েন্সকরদের মত আবেগীয় ভিডিওর দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
ক্লিক-নির্ভর আবেগীয় কনটেন্ট ধীরে ধীরে সত্যনিষ্ঠ সংবাদকে আড়াল করে দিচ্ছে।
একটি ভিডিও যত বেশি নাটকীয়, তত বেশি জনপ্রিয়; একটি তথ্য যতই যাচাই করা হোক, ততই ধীর হয়ে পড়ে।
এই প্রতিযোগিতা একসময় আমাদের সমাজকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সত্যের মূল্য কমে যাবে, আর আবেগের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাবে।
আবেগীয় কনটেন্ট মানুষের মনকে মুহূর্তেই আন্দোলিত করে কিন্তু দায়বদ্ধ সংবাদ মানুষের চিন্তাকে দীর্ঘমেয়াদে তৈরি করে।
একটি জাতি শুধু বিনোদনে বড় হয় না; বড় হয় সচেতনতা, জ্ঞান, যুক্তি এবং দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। আবেগী কনটেন্ট আমাদের মনোযোগ পায়—কিন্তু সংবাদই আমাদের দিকনির্দেশনা দেয়।
আমরা কি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠুক অস্থির আবেগের ওপর?
নাকি চাই, তা নির্মিত হোক তথ্যনিষ্ঠ যুক্তির ভিতের ওপর?
যদি আমরা সত্যকে ভালোবাসি, ন্যায়কে চাই এবং দেশকে এগিয়ে নিতে চাই—তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অবশ্যই হতে হবে দায়বদ্ধ, তথ্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।অস্বচ্ছ জনপ্রিয়তা সমাজের কোন উপকারে আসে না,দায়বদ্ধ সাংবাদিকই সমাজের দর্পণ।
(লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক)
এ জাতীয় আরো খবর..