শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী :
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আটকেপড়া পাকিস্তানি ক্যাম্পবাসী বিহারীদের (উর্দুভাষী) বিভিন্ন দাবি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সংযুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১১ টায় নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রেসক্লাবের সামনে এই কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে সৈয়দপুরের ২২ টি ক্যাম্পে বসবাসরত সহস্রাধিক নারী-পুরুষ অংশ গ্রহণ করেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে এই মানববন্ধনে আয়োজক সংগঠনের সভাপতি উর্দু কবি মাজিদ ইকবালের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার, সাধারণ সম্পাদক শাহীন আক্তার, সহকারী সেক্রেটারি এরশাদ হোসেন পাপ্পু, পৌর জামায়াতের আমীর শরফুদ্দিন খান, ট্রাফেলস ব্যবসায়ী রবিউল আলম রবি।
সভাপতির বক্তব্যে উর্দু কবি মাজিদ ইকবাল তাদের দাবিসমূহ তুলে ধরে বলেন, আপনারা জানেন, ২০০৮ সালে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে বাংলাদেশে বসবাসরত সকল উর্দুভাষী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পায় হয়। উক্ত রায়ের ভিত্তিতে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সুনাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার পায় এবং সেই ভোটাধিকার তারা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োগ করে আসছে।
কিন্তু দেশের উর্দুভাষীদের বড় অংশই ঢাকাসহ দেশের ৯টি জেলায় ১১৬টি ক্যাম্পে আধুনিক প্রায় সকল মৌলিক মানবিক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এমন এক বাস্তব পরিস্থিতিতে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের উর্দুভাষীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দল ও জোটের প্রতি আমাদের দাবিসমূহ হলো
১. জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে যেসব এলাকায় উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বেশি বসবাস করে সে সব এলাকায় উর্দুভাষীদের মধ্য থেকে যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সংরক্ষিত মহিলা আসনে কমপক্ষে একজনকে সংসদ সদস্য হিসেবে দল থেকে মনোনয়ন দেয়ার সংরক্ষণ নীতি থাকতে হবে।
২. ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার লক্ষে সরকারের যথাযথ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্থায়ী পুনর্বাসন সেল গঠন করতে হবে এবং সে লক্ষে একটি পুনর্বাসন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে হবে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই উর্দুভাষীদের মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে।
৩. স্থায়ী পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক উর্দুভাষীদের কোনো ক্যাম্প উচ্ছেদ করা যাবে না এবং ক্যাম্পের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষীদের সংবিধান বর্ণিত 'পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর' আওতায় এনে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অধীন তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
৫. ক্যাম্প সংলগ্ন সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন করে ক্যাম্পের শিশুদের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উর্দুভাষীদের ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. ক্যাম্পগুলোর স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাবার পানির এবং স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারিভাবে কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থা করে ক্যাম্পবাসীদের জন্যে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
৭. ভাষাভিত্তিক সংখ্যা-অল্প জনগোষ্ঠী হিসেবে উর্দুভাষীদের ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
শেষে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, আমাদের ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সহায়তা করবেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে আমরাও অংশীদার।
অন্য বক্তারা উর্দুভাষীদের এসব দাবির সাথে সহমত পোষণ করে তা বাস্তবায়নের নিজ নিজ দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার আশ্বাস দেন এবং স্থানীয়ভাবে দাবিগুলো পূরণে সার্বিক সহযোগিতা ও প্রচেষ্টা করা হবে বলে জানান।
এ জাতীয় আরো খবর..